download

বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১

জীবনানন্দের মৃত্যুরহস্য

হিন্দোল ভট্টাচার্য

http://thesangbad.net/images/2021/February/18Feb21/news/aaaaaaaa.jpg

বর বেশে জীবনানন্দ দাশ

গলিটার মধ্যে একটা ভেজা অন্ধকার। আকাশে চাঁদের আলো আছে কিনা তিনি একবার মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু চোখে পড়ল না। বাতাসে মিশে আছে একটা বিশুষ্ক গন্ধ। এ গন্ধ কি হতাশার? এ গন্ধ কি বিষাদের? শহরের হেমন্তের? এ শহরে কি সবসময়ের জন্য হেমন্তই থাকে? রিক্ততার একটা গন্ধ চারিদিক থেকে ভেসে আসে। ভেসে আসে মশলার গন্ধ, দরদামের আওয়াজ! কে যে কার ক্রীতদাস, তবু আমাদের তো কারো কোনও সোনারুপো নেই! একটু এগিয়ে গেলেই টেরিটিবাজার ছাড়িয়ে একটা রাস্তার মোড়। বাস যায়, ট্রাম যায়! কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে! তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়! এ শহরের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু কই তাঁর লেখায় তেমন কলকাতা? তিনি যে বিশাল বড় মাপের কবি, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কারুবাসনায় শুধু কেন এত শান্তি, শুধু কেন এত সুন্দর! তাঁর ঈশ্বর শুধু এত বড় মাপের নির্লিপ্ত মহান পরম কল্যাণময় কেন? তিনি কি দেখতে পান না প্রাণভয়ে ছুটে যাওয়া ইঁদুরের প্রাণের উপর কীভাবে আকস্মিক ছোঁ মারে চিল, বাজ, পেঁচার পৃথিবী? ঈশ্বর কি ততটাই বিধ্বংসী নন, ততটাই রুদ্র নন, যতটা তিনি পরম কল্যাণময়? এই যে এত আলোর কলকাতা, আর তার পাশে এত অন্ধকারের কলকাতা, এসব কিছুই তাঁর নজরে পড়ল না। তিনি যেন এ শহরে থেকেও এ শহরে নেই। কিন্তু তাঁর কথা থাক। আমাদের কবি একা হেঁটে বেড়াচ্ছেন এই শহরের গলিঘুঁজি দিয়ে। তাঁর চোখে পড়ছে ‘হাইড্র্যান্ট খুলে কুষ্ঠরোগী চেটে নিল জল/ অথবা সে হাইড্র্যান্ট হয়তবা গিয়েছিল ফেঁসে/ এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে/ একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে’। তাঁর মনে হয় যদি এ শহরে দেখা হয় এডগার অ্যালান পো-এর সঙ্গে। নগরের বাতাসে, আলো-অন্ধকারে, সোঁদা গন্ধের ভিতর, ভ্যাপসা গন্ধের ভিতর, ক্যাকোফনির ভিতর যে মিস্টিসিজম কাজ করে, তা মনে হয় প্রকৃতির মিস্টিসিজমের চেয়েও অনেক বেশি মিস্টিক। এই এত ধুলো ধোঁয়ার ইট কাঠ পাথরের কালবেলায় তিনি ঘুরে বেড়ান একজন আউটসাইডারের মতো, বোদলেয়ার যেভাবে প্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, দস্তয়ভস্কি যেভাবে মস্কোয়।

তাঁর যে মৃত্যুভয় হয় না, এমনটাও নয়। মৃত্যুভয় একটা আশ্চর্য হাতছানির মতো।

এই যে এত আলোর কলকাতা, আর তার পাশে এত অন্ধকারের কলকাতা, এসব কিছুই তাঁর নজরে পড়ল না। তিনি যেন এ শহরে থেকেও এ শহরে নেই। কিন্তু তাঁর কথা থাক। আমাদের কবি একা হেঁটে বেড়াচ্ছেন এই শহরের গলিঘুঁজি দিয়ে

মনের মধ্যে এক চিরকালীন হেমন্তকাল থমথম করে। মনে পড়ে অতীশ দীপঙ্করের কথা। কত পার্থক্য তাঁর সঙ্গে আমাদের! আঠেরোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একসঙ্গে। ঊনষাট বছর বয়সে তিব্বতযাত্রা। সেখানে ছ’মাসের মধ্যে তিব্বতী শিখে সেই ভাষায় বলতে পারা, লিখতে পারা। বেশ কয়েকটি বইও আছে তিব্বতী ভাষায়। তিনিই কি বাংলার শেষ জ্ঞানচর্চার প্রদীপ? মনে পড়ে তিনি যে যে জায়গায় গিয়েছিলেন। মনে পড়ে তাঁর সমুদ্রযাত্রায় জাহাজডুবিও হয়েছিল। ওই যে ট্রাম এগিয়ে আসছে। কী নিঃশব্দে যে এগিয়ে আসে ট্রাম। ট্রাম কি মৃত্যুর মতো? না কি প্রেমের মতো? থেমে গেলেন তিনি। যেতে দিলেন ট্রামকে। মৃত্যুর কথা ভাবলেই তাঁর মনে হয় পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে তাকিয়ে থাকা বনলতা সেনের কথা। এত কেন আশ্রয়ের সন্ধানে থাকি আমরা? সত্যিই কোথাও কি কারোর আশ্রয় রয়েছে?এই যে বনলতা, তিনিই কি ঈশ্বর? হায় রবীন্দ্রনাথ, আমাদের কবি কোনদিন পেলেন না আপনার সুন্দর, ব্রাহ্ম পরম কল্যাণময় ঈশ্বরকে। কীভাবে পাবেন তিনি? তাঁর কাছে প্রেম বা নারী বা ঈশ্বর এত সুন্দর নয়। বরং অনেক বেশি সত্য। তাঁর কাছে সত্যই সুন্দর। কিন্ত সত্যও তো একরকম নয়। সত্য তো নানারকম। এসব মনে করলেই রক্তের ভিতরে ঢুকে পড়ে বিষাদ। আর সে এক হিংস্র বিষাদ। এক বিস্ময়ের বিষাদ। এর স্বরূপ ঈশ্বরকে দেখার মতোই বিস্ময়ের। কিন্তু এর সঙ্গে দেখা হওয়া মনের মধ্যে সেই প্রশান্তির জন্ম দেয় না, যার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তাঁকে,- ‘বড়রকম রচনার মধ্যে এক প্রশান্তি আছে’। কিন্তু কেন এই প্রশান্তি থাকবে, এ কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় আমাদের কবির। তিনি তো এক আউটসাইডার। যেখানেই যান, চারিপাশে গ্রাম থাকুক বা এই শহর, প্রেমের নারী থাকুক, বা সন্তান, বাংলার ঘ্রাণ থাকুক, বা অন্ধকার শহরের রাত্রি, কোথাও তিনি একাত্ম হতে পারেন না, না কেউ তাঁকে একাত্ম করে নিতে পারে। ‘কেন তবু এমন একাকী’? এই একাকিত্বের কথা তিনি ভেবেছেন অনেকবার। শীতরাতে বিড়ালের কান্না যখন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ভেসে আসে, তখন তিনি এমন একাকী হয়ে যান, অথবা একাকী হয়ে যান বলেই তিনি শুনতে পান এই বিড়ালের কান্না। এক আচমকা হিম তাঁকে ঘিরে ধরে। এই হিম ঠিক শীত নয়। এই শীতও নয়, শুধুই শীত। লাশকাটা ঘরে শুয়ে থাকা লাশের গায়ে যে ঠান্ডাটা থাকে, এটা যেন তেমন। তিনি নিজের শরীরে নিজেই হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখতে থাকেন। নিজেকেই নিজে পরখ করতে থাকেন। পো, আপনার মৃত্যু কেন এভাবে হল? কেন কেউ জানতে পারল না কোন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে আপনি ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতেন? কেন আপনিও ছিলেন একজন আউটসাইডার? আত্মহত্যার কথা মনে পড়ে। কিন্তু আত্মহত্যাও তো এক সুনিপুণ হত্যা। খুব সহজ নয় আত্মহত্যা করা। তিনি জানেন একদিন সমস্ত কিছুই বরফের চাদরে মুড়ে যাবে। পৃথিবীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ লেখা, সমস্ত শ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তিই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। কিছুই থাকবে না। নশ্বরতার এই হলো আসল ঐশ্বরিক রূপ। সব নষ্ট হয়ে যাওয়া। সব জীর্ণ হয়ে যাওয়া। সব ধ্বংস হয়ে যাওয়া। তবু মনে হয়, যা যা লিখছি, যা যা ভাবছি তা যদি লিখে যাই! তা যদি রেখে যাই। এমন একটা ম্যাজিক ট্রাঙ্ক কি পাওয়া সম্ভব নয়, যা হিমযুগের সময়েও বাঁচিয়ে রেখে দেবে এই লেখাগুলিকে? হয়ত পরের কোনও সভ্যতার মানুষ এই সব খাতাগুলিকে খুঁজে পেয়ে সিন্ধুলিপির দিকে যেমন আমরা তাকিয়ে ভাবি, কিন্তু পাঠোদ্ধার করতে পারি না, তেমন তাকিয়ে থাকবে! কিন্তু তাহলেইবা কী হল! শব্দ অক্ষর তো শুধু কঙ্কালমাত্র। আসল বিষয় হল- যা বলা হচ্ছে! যা ভাবা হচ্ছে। আসল বিষয় তো হলো বোধ। স্বপ্ন নয়, প্রেম নয়, শান্তি নয়, কোনও এক বোধ কাজ করে মাথার ভিতরে। এই বোধ কি সেই ইন্টিমেট ঈশ্বর, তিনি তথাকথিত সুন্দর নন, যাঁর আসলে তেমন সুন্দর কিছু করার নেই। বোধ কি শুধুই সুন্দর হবে? বোধ কি শুধুই প্রশান্ত করবে মন? বোধ অস্থির করবে না? বিপন্ন করবে না? কিন্তু আউটসাইডার না হলে তো কেউ এই অনুভূতিমালার কাছে পৌঁছতেই পারবে না। কেন যে সব কাজ তুচ্ছ মনে হয়, পন্ড মনে হয়, প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয় সে হাতে হাত রাখলেই, তা বোঝা সেই সব স্থির আধ্যাত্মিকদের পক্ষে সম্ভব নয়, যাঁরা ঈশ্বরকে এক আলটিমেট গড হিসেবে প্রিয় করেন বা প্রিয়রে দেবতা। এই দেবতা আর বোধ এক নয়। বোধও এক ঈশ্বর, কিন্তু সে বিপন্ন করে। সে বলে ‘নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ নয় সবখানি/ অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়/ আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে,/ ক্লান্ত-ক্লান্ত করে,/ লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই/ তাই লাশকাটা ঘরে/ চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।” এলিয়ট লিখেছিলেন- ‘পেশেন্ট ইথারাইজড আপঅন এ টেবিল’। কিন্তু এই শীত, তার চেয়েও ভয়ংকর। আর এই ভয়ংকর তার চেয়েও ঐশ্বরিক। একা জীবনানন্দের এই নাগরিক আধ্যাত্মিকতার কাছে আমরা নতজানু হতে বাধ্য হই। গৌতম বুদ্ধের কথা মনে পড়ে। তিনিও তো একদিন সবকিছু ছেড়ে ‘দেখিল কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?/ অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল।’ জরা, জীর্ণ, দুঃখের কারণ অনুসন্ধানে তিনি বেরিয়ে এলেন সবকিছু ছেড়ে। তার পর তিনি নীরব হয়ে গেলেন। নিরীশ্বর এক আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ডুব দিলেন। তাঁর কি কোনও এমন হৃদয়ের দেবতা ছিল না? যিনি তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকেন, হাত রাখেন হাতে? কে থাকেন এমনভাবে? কে আসেন এমন নিভৃতে ট্রামের মতো? কে পিছু নেন? কে জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা বলে? কে তাঁকে এমন একাকী করে দেন? তিনি কি ঈশ্বর, শিল্প, মৃত্যু, বোধ, না কি তাঁর স্বরূপ জানা যায় না কখনও। এক আকাশ হেমন্তের বিষাদ এসে মুখ দেখিয়ে যায়।

জানি, এই একাকী ঘুরে বেড়ানো ছাড়া বস্তুত জীবনেই আর কিছু করণীয় নেই। কারণ ‘কখন মরণ আসে, কে বা জানে, কালীদহে কখন যে ঝড়/ কমলের নাল ভাঙে!’ তিনি জানতেন জীবন এক অসমাপিকা ক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। একটা অন্ধকার থেকে জন্মানো এবং আরেকটা অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। অন্ধকার থেকে অন্ধকারের মধ্যে এই যে যাপন সেখানে জন্ম নিয়েছিল তাঁর এই অস্তিত্ববাদ। তাঁর আগে এই অস্তিত্ববাদের, এই অনিশ্চিত অস্তিত্ববাদের সঙ্গে কথা বলেনি বাংলা কবিতা। শুধু কবিতার কথাই নয়, তিনি ভাবেন, রাসবিহারীর মোড়ে দাঁড়িয়ে, জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী তবে অস্তিত্ববাদের মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া নিজেকে? ‘লীন হয়ে গেলে তারা তখন তো মৃত/ মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনও/ মৃতেরা কোথাও নেই, -আছে?/ কোনও কোনও অঘ্রাণের অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া শান্ত মানুষের/ হৃদয়ের পথে ছাড়া/ মৃতেরা কোথাও নেই বলে মনে হয়/ তাহলে মৃত্যুর আগে আলো-অন্ন-আকাশ-নারীকে/ কিছুটা সুস্থিরভাবে পেলে ভালো হত।” এ কী কথা মাথায় এল তাঁর? তাঁর লজ্জা হল কিছুটা। আর সেই লজ্জার তরঙ্গেই হয়ত উড়ে গেল কয়েকটা চিল। সোনালি ডানার চিল। এ কী ভাবলেন! এই ভাবনার মধ্যে তো প্রজ্ঞা নেই। এই ভাবনার মধ্যে তো রয়েছে একজন অতি সাধারণ মানুষ, যে আহার নিদ্রা মৈথুনের চূড়ান্ত ভোগের মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সঙ্গে জীবনানন্দের তো একটা পার্থক্যও রয়েছে। তিনি তো জানেন, এলিয়ট লিখে ফেলেছেন সেই হলো মেন-এর সেই অসামান্য লাইনগুলি- উই আর দ্য হলো মেন/ উই আর দ্য স্টাফড মেন/ লিনিং টুগেদার/ হেডপিস ফিল্ড উইথ স্ট্র।” খড়ের তৈরি মাথা তবে? ফাঁপা অস্তিত্ব। চোখের জায়গায় চোখ নেই। অন্ধকার করোটি শুধু রয়েছে, যেখানে শুধু কিছু শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শুধু কিছু ধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর সে থ্যাঁতা ইঁদুরের রক্তমাখা ঠোঁটে পড়ে থাকছে। যদি এই পৃথিবী থেকে, এই মহাজগত থেকে শুধু লীন হয়েই যেতে হয়, শুধু কোনও কোনও হৃদয়ের পথে ছাড়া নেই কেউ, থাকবে না কেউ, তাহলে যতক্ষণ বেঁচে আছে, কেন আলো-অন্ন-আকাশ-নারীকে কিছুটা সুস্থির ভাবে পাবে না এ জীবন? কেন তবে স্বপ্ন নয়, প্রেম নয়, আশা নয়, কোনও এক বোধ সেই কবিকে ছুটিয়ে নিয়ে চলবে? কেন সেই বোধ যখন কবির হাতে হাত রাখবে, তখন সমস্ত জাগতিক সফলতা তার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। তিনি বুঝতে পারবেন, “কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়েই শিল্পসৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভেতর কল্পনা ও স্বপ্নচিন্তার দুেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়।

বোধ কি শুধুই সুন্দর হবে? বোধ কি শুধুই প্রশান্ত করবে মন? বোধ অস্থির করবে না? বিপন্ন করবে না? কিন্তু আউটসাইডার না হলে তো কেউ এই অনুভূতিমালার কাছে পৌঁছতেই পারবে না

যে উদ্যম ও আকাঙ্খার নিঃসংকোচ সাংসারিকতা ও স্বাভাবিকতা স্বরাজপার্টি গঠন করতে পারত, কিংবা কংগ্রেস, অথবা একটা মোটর কার, কিংবা একটা নামজাদা বই বা চায়ের দোকান, অথবা একজন অক্লান্তকর্মী চেয়ারম্যানকে তৈরি করতে পারে, অসীম অধ্যবসায়ী উকিলকে, কিংবা সচ্চরিত্র হেড মাষ্টারকে, মুচিকে, মিস্ত্রিকে সেই আকাক্সক্ষা উদ্যম নেই আমার।” কেমন মাল্যবান আপনার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন? আপনার সমস্ত উপন্যাসেই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, একা শীতের মধ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যে কুঁকড়ে যেতে যেতে আপনার সঙ্গেই দেখা হয়। তেমন ভাবে খুব একটা আলাদা কোনও গল্পের সঙ্গে দেখা হয় না। রূপদক্ষ প্রকৃতির নির্জনতম কবি বলে আপনার সঙ্গে যে হাত মিলিয়ে দেওয়া হয়, জানতেও দেওয়া হয় না, আপনার এই বাংলা আসলে রুপসী নয়, বরং ত্রস্ত। আপনার মহাপৃথিবীতে নাগরিকতা কথা বলে চলে আপনার প্রকৃতিপ্রেমের পাশাপাশিই। অথবা সেই সব প্রকৃতির রূপ হয়ত এক একটি অর্থ হিসেবে আপনার সঙ্গে হাজির হয়। মাঝেমাঝে মনে হয়, পো বা ডেলামেয়ারের মতোই আপনি প্রকৃতির মধ্যে থেকেই অশনি সংকেত খুঁজে নিতেন। বুড়ি প্যাঁচার পাশাপাশি রোগা শালিখ, মরাইঁদুর, শূকরের প্রসববেদনার পাশে নির্জনে নীরবে মহীনের ঘোড়াগুলির ঘাস খেয়ে যাওয়া। আমরা যাইনি মরে আজও, তবু কেবল-ই দৃশ্যের জন্ম হয়। যে যে দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে, যে যে পাখির উড়ে যাওয়া দেখি, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে বলতে বলতে যে সব সোনালি চিল উড়ে এসে বসে চিমনির কাছাকাছি, এই সমস্ত দৃশ্যই কি তবে পূর্বনির্ধারিত? আমার মনে হয় অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে আপনার জন্মান্তরের কোনও একটি সম্পর্ক আছে। কিন্তু কামুর সঙ্গেও কি ছিল? আলবেয়ার কামু কি আপনার অলটার ইগো? তিনি কি জানতেন সুদূর কলকাতা শহরে বসে একজন মানুষ অনেকটা তাঁর মতো বা তাঁর চেয়েও বিপন্ন কোনও ভাবনার কথা ভেবে চলবেন? কোথাও একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা রয়েছে সমস্ত চরিত্র।

http://thesangbad.net/images/2021/February/18Feb21/news/up-2.jpg

রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার গ্রহণ করছেন কবি জীবনান্দ দাশ

পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষ প্রকৃতপ্রস্তাবে এক একজন আউটসাইডার হন। তাঁদের আসলে কোনও শহর থাকে না, দেশ থাকে না। তাঁরা যে অন্ধকারকে ভালোবাসেন এমনটা নয়। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে তাঁদের যেতে হয়। পূর্ণতার ঈশ্বরচেতনা না, বরং এক শূন্যতার আবহমান অবচেতনা তাঁদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শূন্যতাও কিন্তু এখানে আবহমান। যে আবহমান শূন্যতার কাছে জীবন-মৃত্যু সমস্ত কিছুই অর্থহীন হয়ে পড়েছিল একসময়ে গৌতম বুদ্ধের কাছে। শূন্যতার এই আবহমানতা যখন আধুনিক মানুষের জীবনযাপনের কাছে ভাষা খুঁজে পায়, তখন সে একজন আউটসাইডার হয়ে পড়ে। অন্তরে বাইরে, নির্জন মনের ভিতর একজন আউটসাউডার না হলে তো কখনও মঁসিয়ে মার্সেল্লো তৈরি হয় না, তেমন তৈরি হয় না একজন কাফকা। কীভাবে একজন মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তিনি একজন পোকা হয়ে গেছেন? কীভাবে রাসকলনিকভ এক নেতির বিশ্ব গড়ে তোলেন তাঁর চারিদিকে? জীবনানন্দ অজান্তে, সারা পৃথিবী জুড়ে আবহমান এই একা মানুষের বিশ্বের এক নিরন্তর প্রতীক হয়ে গেলেন। তাঁর লেখায় তাই বারবার ফিরে এল হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশার কথা। যেন তিনি সবসময়ের জন্যই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যে শ্রাবস্তীর ভাস্কর্যের কথা তাঁর কবিতায় এসেছিল, তিনি যে ইতিহাসযানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন হাজার বছর, তার পাশাপাশি তিনি দেখতে লাগলেন আধুনিক যাপনের মহাপৃথিবীকে। সেখানে তিনি দেখলেন- নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মতো। গোটা কলকাতা শহরকে এমন ম্যাজিক রিয়ালিস্টিকভাবে আগে তো কেউ দেখেননি। এই শহরের মধ্যে তবে কি তবে অনেকগুলো পৃথিবীর শহর রয়েছে? এই শহরের অন্ধকারগুলি তবে আলাদা? ডিমলাইটগুলি আলাদা? দুঃস্বপ্নগুলি আলাদা? আপনিই প্রথম এই শহরকে চিনলেন জীবননান্দ। আপনাকে এই শহর তাই ক্ষমা করল না।

ঠিক, একটু নির্মম চোখে দেখেছেন তিনি। যেন লোভ লালসা হিংসার অন্ধকার ছিটকে ছিটকে বেরোচ্ছে এই শহরের গলিগুলি থেকে। ওই তো দেখতে পাচ্ছি আপনাকে জানবাজার থেকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। এই রাস্তাগুলিতেই কেন? আপনি তো রেড রোড ধরতে পারতেন। যেখানে ভিড় নেই, যেখানে ব্যস্ততার অন্ধকার নেই, রহস্যের গোলকধাঁধা নেই। কিন্তু আপনার কাছে নির্জন ঘুরে বেড়ানোর রাস্তাগুলি নয়, যেখানে আপনি আকাশ বাতাস আলো চাঁদ ফুল পাখির সঙ্গে একটু নিরিবিলি যাপন করতে পারবেন। আপনি ভিক্টোরিয়া গেলেন না, গঙ্গার ধারেও যে খুব একটা গিয়ে বসে থাকলেন এমনটা নয়। আপনাকে টানল কলকাতার অন্ধকার রাস্তাগুলো। টানল অপরাধপ্রবণ অন্ধকারগুলো। সুন্দরের সঙ্গে যাপন তো আপনি করেননি। আপনি সুন্দর নয়, খুঁজেছেন রহস্যের জটিলতাগুলি। বড় বেশি মিল খুঁজে পাই বিপর্যস্ত বোদলেয়ার, বা ছটফটে অন্ধকারাচ্ছন্ন এডগার অ্যালান পোর সঙ্গে। আপনি কি জানেন, পো-রও রহস্যময় মৃত্যু হয়েছিল, এভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে। আপনারও তাই। কিন্তু কেন? কোনও ফরেনসিক পরীক্ষা হয়নি। কেউ অনুসন্ধান করেননি। কেউ কোনও অতিপ্রাকৃতিক কারণের কথাও বলেননি। এতদিন বাদে আপনার মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে হয়ত কিছুই পাওয়া যাবে না। তবে, এ কথা জানা গেল, যে আপনি জিজ্ঞেস করতেন ভাইকে বা আরও বেশ কয়েকজনকে, আচ্ছা রাসবিহারীর ওদিকে একটা ট্রামের দুর্ঘটনা হয়েছে, তোরা কিছু শুনেছিস? আপনি কী করে জানতে পেরেছিলেন সে সব কথা? আপনার মনে কীভাবে এসেছিল? তবে কি কেউ আপনাকে হুমকি দিয়েছিল? পো-র উপন্যাসের খুনী চরিত্রগুলি না হয়, পোর উপন্যাসের কাহিনিগুলির মতোই শুরু করেছিল অভিনব সব হত্যাকান্ড। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে কী হয়েছিল? কেনইবা আপনার কবিতায় বারবার থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটের কথা ফিরে ফিরে আসত? কেন এই দুর্ঘটনার চিত্রকল্প? কেন কলকাতা শহর মানেই আপনি হাঁটছেন আর কেউ আপনার পিছু নিয়েছে? অনিশ্চয়তাকে আপনি বারবার লিখছেন এখানেই,- এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা! আপনি দেখতে পাচ্ছেন-

নগরীর রাজপথে মোড়ে মোড়ে চিহ্ন পড়ে আছে;

একটি মৃতের দেহ অপরের শবকে জড়ায়ে

তবুও আতঙ্কে হিম- হয়তো দ্বিতীয় কোনো মরণের কাছে!

(সাতটি তারার তিমির)

জীবন-প্রণালীতে আপনি লিখছেন- “ধীরে ধীরে জ্যোৎস্নার পথের মধ্যে বেরিয়ে গেলাম। এ-রকম চলতে পারা যায় নাকি? মাঠ-প্রান্তর ভেঙে, জানা-অজানার ওপারে, জ্যোৎস্নার আকাশে-বাতাসে বুনো হাঁসের মতন, যে-পর্যন্ত, যে-পর্যন্ত শেষ গুলি এসে বুকের ভিতর না লাগে।” ঠিক বুঝতে পারছি না আপনাকে। আপনি কি তবে গোপন একটা ভাষায় আপনার মৃত্যুরহস্য লিখতেন সারাজীবন ধরে? না কি আপনি একাকী তদন্ত করতেন কলকাতার বিভিন্ন মৃত্যুর? এই জন্যই কি আপনি একা একা কলকাতার চীনে পট্টি, টেরিটিবাজারের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতেন? আপনার পিছু কেউ নিত না কি আপনি কারো পিছু নিতেন? যত বুঝতে পারছি না, তত বেশি করে আপনার মৃত্যুরহস্য আরও বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। কার পিছু নিয়েছিলেন আপনি, বা কে আপনার পিছু নিয়েছিল, যার জন্য চলন্ত ট্রামের সামনে দিয়েও আপনি পেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন?

আপনি কি মৃত্যুর পিছু নিতেন? পিছু নিতেন কোনও নিজেকে গোপন রাখা সিরিয়াল কিলারের? আপনি জানতেন মুক্তি নেই এসবের হাত থেকে। তাই লিখে রেখেছেন অন্ধকার দ্বিপ্রহরের আর বুক ভারি রুদ্ধ করে দেওয়া সেই সব উপন্যাসগুলি। কিন্তু আপনি রহস্য উপন্যাস লেখেননি পো-এর মতো। আপনি সেটিও লিখতে পারেননি। আপনার একার যাপনের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল এই একার বিড়বিড়ানিগুলি। ভূতে পাওয়া এক আশ্চর্য গোয়েন্দার মতো নীরিক্ষণ করেছেন আপনি চারিদিক। একজন কবি, একজন দার্শনিকের তুলনায় এক অন্য কোনও জানলা দরজা ঘর আকাশের সন্ধান পেয়ে যান: “নিবিড় রমণী তার জ্ঞানময় প্রেমিকের খোঁজে /অনেক মলিন যুগ- অনেক রক্তাক্ত যুগ সমুত্তীর্ণ ক’রে,/আজ এই সময়ের পারে এসে পুনরায় দেখে/আবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চড়ে।”

তিনি দেখেছেন-

সমুদ্রের পরপার থেকে, তাই স্মিতচক্ষু নাবিকেরা আসে

ঈশ্বরের চেয়ে স্পর্শময়

আক্ষেপে প্রস্তুত হয়ে অর্ধনারীশ্বর

তরাইয়ের থেকে লুব্ধ বঙ্গোপসাগরে

সুকুমার ছায়া ফেলে সূর্যিমামার

নাবিকের লিবিডোকে উদ্বোধিত করে!

কিন্তু এই যে আপনার শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর ভিতর লিবিয়ার জঙ্গল চলে আসছে, আফ্রিকার আদিম নৃত্য চলে আসছে, বাংলার প্রকৃতির রহস্যময়তা চলে আসছে, একটা বিশাল সময়ের প্রেক্ষিত থেকে আপনি দেখছেন আপনার সময়কে। আর তা হয়ে উঠছে চিরকালীন, আপনি গভীর চোখে অনুসন্ধান করছেন বিভিন্ন সময়ের হাতের ছাপ। আর আশ্চর্যভাবে সময় দেশ-কালের কাঁটাতার ডিঙিয়ে সেই সমস্ত হাতের ছাপ ধরা দিয়েছে আপনার চোখের সামনেই। আসলে সময়ের নিজের কোনও দেশ নেই। সেও আপনার মতো নির্দিষ্ট কোনও দেশে আটকে থাকতে চায় না। সে বিভিন্ন সময়ের মধ্যে, বিভিন্ন দেশ-কালের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিতেই ভালোবাসে। হয়ত সেও গভীর কোনও অনুসন্ধানে রয়েছে। কীসের অনুসন্ধান, সেটাই তো আপনার আমার তদন্তের বিষয়। আর তাই যিনি খোঁজেন, তাঁর সামনে সময় তার সমস্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে প্রকাশিত হন। আপনি লিবিয়ার জঙ্গল দেখতে পান এই কলকাতার মধ্যেই। দেখতে পান গোধূলিসন্ধির নৃত্য। দেখতে পান- প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন, এখনও ঘাসের লোভে চড়ে। আপনি এমন এক বিপজ্জনক কার্নিস থেকে কার্নিসে হেঁটে বেড়ান, যার চারিদিকে খাদ। একটি খাদে পড়ে গেলেই, আর তার পক্ষে উঠে আসা সম্ভব নয়। কারুবাসনা কি তবে এটিই? সময় এবং অন্ধকারের ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলিকে খুঁজে বের করার?

জানি, কোনও রহস্যেরই আসলে কোনও কিনারা হয় না। কারণ সমস্ত রহস্যই হলো সেই নিরভিসন্ধির মতো। তার পিছনে ছুটে যাওয়া যায়। কিন্তু সে ক্রমশ আরও আরও অনেক বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে। জলপাইহাটি উপন্যাসে নিশীথ বলছে ধনী বন্ধু জিতেন দাশগুপ্তর স্ত্রী নমিতাকে- মানুষের দুটো নিস্তব্ধতা আছে পৃথিবীতে- মৃত্যু আর ঘুম, এছাড়া আর সবই শেষ পর্যন্ত অজ্ঞেয়।

আসলে আপনি দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, দাঙ্গা, ছিন্নমূল হয়ে যাওয়া যে পৃথিবীতে, যে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়াতেন, তার গায়ে লেগে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অন্ধকারের চিহ্ন। পৃথিবীর সমস্ত সময়ের সমস্ত অন্ধকার তখন জড়ো হয়েছিল এই সময়খন্ডের ভিতর। হয়ত অন্ধকার প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছিল আর কখনওই আলোর দিকে আসবে না। অথবা, হয়ত আলো বলে কিছুই নেই। কীসের আলো? আলো তো এক ক্ষণস্থায়ী বিষয়। অন্ধকার প্রকৃত সত্য। কিন্তু অন্ধকারের প্রকারভেদ আছে। যে অন্ধকার মানুষকে মানুষের হন্তারক করে তোলে, যে অন্ধকারে ‘আমাদের সোনা রুপো নেই, তবু আমরা কে কার ক্রীতদাস’ বোঝা যায় না, সেই অন্ধকারে একটি একা লোক খাক হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে, নিরাশ্রয় হয়ে পিছু নেয় স্বয়ং অন্ধকারের। কারুবাসনার অন্ধকার তাকে এমন নিয়তিনির্দিষ্ট করে তৈরি করে কেন? কেন আজীবন ধরে তিনি দেখেছেন মৃত্যুর এই ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়াকে? নিয়তির এই গূঢ় অভিসন্ধির কথা জানা যায় না। অজ্ঞেয় থাকে তা। কিন্তু আমরা এই অজ্ঞেয়-এর কাছে এই তদন্তকে ছেড়ে দিতে পারি না জীবনানন্দ।

জানি, আপনি যে রহস্যের পিছু নিয়েছেন, তা বিপজ্জনক। কেউ বাঁচেননি। কামুর মতো কেউ কেউ হয়ত দুর্ঘটনায় মরেছেন, কেউ কেউ হয়ত পো-এর মতো রহস্যজনক কারণে। এই রহস্যের পিছু নেওয়া কবি, শিল্পী লেখক এমনকী গোয়েন্দার মৃত্যুও হয় রহস্যজনক কারণেই। তাঁরা যেন সময়ের এক ঘূর্ণির মধ্যে তলিয়ে যান। এমনভাবেই তলিয়ে যান, যে মৃত্যুরহস্যের কোনও তদন্তসাপেক্ষা সূত্রই আর পড়ে থাকে না। আমরা শুধু দেখতে পাই তাঁদের লেখা নোটসের রহস্যজনক কিছু অসমাপ্ত বাক্য, আজীবনের কাজে ছড়িয়ে থাকা ইঙ্গিত, তীব্র অনিশ্চয়তা এবং আগামীকে নিয়ে চিন্তাভাবনা। যেন, তাঁরা একটি বিষয় নিশ্চিত, তাঁরা যে পথে গেছেন, আর ফিরে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব।

কিন্তু আমরা তাই বলে আপনাকে খুঁজব না? জানতে চাইব না আপনি কোন অন্ধকার রহস্যসমাধানে একা একা বেরিয়ে পড়েছিলেন? কোন সেই বিপন্ন বিস্ময় আপনাকে প্ররোচিত করেছিল সবকিছু ছেড়ে আরও বেশি বিপন্নতার মধ্যে ঝাঁপ দিতে?

জানতে তো আমাদের হবেই। কারণ আমরা অভিশপ্ত পতঙ্গের জাত। আপনার এত ফিঙ্গারপ্রিন্ট, সে সব কি বিফলে যেতে পারে?


Fatal error: Call to a member function fetch_assoc() on integer in /home/thesangb/m.thesangbad.net/news.php on line 223