আবরার হত্যাকাণ্ডে ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট

image

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বুধবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরেই মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট পাঠানো হয়েছে। দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম। মামলার পর থেকে এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেফতার করেছেন ডিবি। এর মধ্যে এজাহারনামীয় ১৬ জন ও এজাহারের বাইরে ৫ জন। বাকি চারজন পলাতক। পলাতক ৪ জনের মধ্যে তিনজন মামলার এজাহারভুক্ত। তারা হলো-জিসান, তানিন ও মোর্শেদ। এজাহার বহির্ভূত একজন রাফি।

চার্জশিট আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়। তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, আবরার হত্যায় সরাসরি অংশে নেয় ১১ জন। বাকি ১৪ জন হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত রয়েছে। তিনি বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভ্যস্ততার অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত। কেউ তাদের সালাম না দিলে, দ্বিমত পোষণ করলে, তাদের সামনে হাসলে ইত্যাদি কারণে র‌্যাগিংয়ের নামে তারা নতুনদের নির্যাতন করতেন।

হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে মনিরুল ইসলাম বলেন, একক কোন কারণে আবরার হত্যাকাণ্ডটি হয়নি। সে শিবির করে কি-না, হত্যার পেছনে এটি একটি মাত্র কারণ। সংবাদ সম্মেলন শেষে তদন্ত দলের পক্ষ থেকে একটি স্কেচ ভিডিও দেখানো হয়। সেই ভিডিওতে তুলে ধরা হয় আবরার হত্যার নৃশংস দৃশ্য। প্রত্যক্ষদর্শী, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষীদের দেয়া তথ্যমতে ভিডিওটি তৈরি করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তদন্ত দল। ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের ভিডিটিতে প্রথমে আবরারের প্রাণের বুয়েট ক্যাম্পাস ও তার শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমটি দেখানো হয়েছে। হলের করিডোরে আবরারের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তার বড় ভাইকে (ছাত্রলীগের বড় ভাই) জানাচ্ছেন তার এক রুমমেট। ৪ অক্টোবর আবরারের বিষয়ে হলের ক্যান্টিনে মিটিং করে অভিযুক্তরা। এর পরপরই হলের গেস্টরুমে মিটিংয়ে বসে তারা আবরার ফাহাদকে নিয়ে আলোচনা করে। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বড় ভাইয়ের নির্দেশে কয়েকজন আবরারকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ২০১১ নম্বর রুমে যেতে বলেন। সেদিন আবরারকে তার ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রুমে তাকে ফ্লোরে বসিয়ে একটি পক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করে যে, হলের কেউ বিতর্কিত ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি না? আরেকপক্ষ তার ল্যাপটপ ও মোবাইল চেক করছে।

এ সময় হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। যন্ত্রণায় মাটিতে বমি ও প্রস্রাব করে দেন আবরার। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ২০১১ থেকে ২০০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০৫ নম্বর রুমে তিনি আরও অসুস্থ হলে রুম থেকে বের করে তাকে সিঁড়ির পাশে শুয়ে রাখা হয়। দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়ে থাকার পর বুয়েটের চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর একে একে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের চিত্র দেখায় ডিএমপি। ভিডিওর বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, আদালত সাধারণত সাক্ষ্য হিসেবে এ ধরনের ভিডিও গ্রহণ করেন না। তবে আদালত যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা এটা জমা দেব। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চার্জশিটভুক্ত ২৫ আসামির মধ্যে চারজন পলাতক রয়েছেন। আর বাকি ২১ জন কারাগারে।

আবরার হত্যার আসামি যারা

এজাহারের ১৯ আসামি হলো, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিই বিভাগ, ১৩তম ব্যাচ), সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (১৪তম ব্যাচ, সিই বিভাগ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৫তম ব্যাচ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির (ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল (বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য মুনতাসির আল জেমি (এমআই বিভাগ), সদস্য মুজাহিদুর রহমান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), শামীম বিল্লাহ (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাজেদুল ইসলাম (এমএমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), আকাশ হোসেন (সিই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), মোয়াজ আবু হোরায়রা (সিএসই, ১৭ ব্যাচ), এএসএম নাজমুস সাদাত (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ) ।

এজাহারের বাইরের ৬ আসামি হলো- বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না (মেকানিক্যাল, তৃতীয় বর্ষ), আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং), মিজানুর রহমান (ওয়াটার রিসোসের্স, ১৬ ব্যাচ), শামসুল আরেফিন রাফাত (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং), উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল) এবং মাহামুদ সেতু ( কেমিকৌশল)।

পলাতক ৪ জন হলো এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ), মাহমুদুল জিসান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ) এবং মুজতবা রাফিদ (কেমিকৌশল)। স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ৮ জন- তারা হলো মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, এএসএম নাজমুস সাদাত এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর। হত্যায় সরাসরি জড়িত ১১ জন হলো- মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, শামীম বিল্লাহ, এএসএম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর।

ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত ১১ জন হলো- মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মনিরুজ্জামান মনির, ইফতি মোশাররফ সকাল, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ এবং মুজতবা রাফিদ। এ মামলায় গ্রেফতার ২১ জনের মধ্যে ৮ জন ইতোমধ্যে আদালতে দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। আবরারকে কীভাবে ক্রিকেট স্টাম্প আর স্কিপিং রোপ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে বেধড়ক পেটানো হয়েছিল, সেই ভয়ঙ্কর বিবরণ ওঠে এসেছে তাদের জবানবন্দিতে।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যা করা হয়। ৭ অক্টোবর দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে আবরারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ওই ঘটনায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। বুধবার এ ঘটনায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে ডিবি।