ঈদে বাড়ি ফেরা পথে পথে ভোগান্তি

image

ঠাঁই নাই ট্রেনে, ঈদে বাড়িমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদেও যাত্রী-সংবাদ

ঈদের আর মাত্র এক দিন বাকি। আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। তবে রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে যানজট, অতিরিক্ত বোঝাই, পরিবহন ও টিকিট সংকট, ভাড়া নৈরাজ্যসহ নানা ভোগান্তি শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া রেলওয়ের শিডিউল বিপর্যয়, নৌপথের অতিরিক্ত বোঝাইয়ে লঞ্চের ছাদে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হচ্ছে। ঈদযাত্রায় পথে পথে নানা ভোগান্তি শিকার হলেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন অন্যরকম আনন্দের বলে জানান তারা। সরেজমিনে রাজধানীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, শুক্রবার (৯ আগস্ট) সকাল প্রতিটি টার্মিনালে ছিলো গ্রামমুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ- সব পরিবহন ঢাকা ছাড়ে যাত্রী বোঝাই করে। কোথায় ও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ছাদে যাত্রী উঠা নিষেধ থাকলেও কেউ তা মানছে না। প্রতিটি ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তবে সড়কে পরিবহন সংকটের কারণে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বাস ও মিনিবাসে যাওয়া যাচ্ছে না। দুই একটি বাস আসলেও তা মুহূর্তের মধ্যে তা যাত্রী বোঝাই হয়ে যাচ্ছে। এই সুযোগে পরিবহন চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে বলে যাত্রীরা জানান। ঈদ বকশিস হিসেবে দ্বি-তিনগুণ ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা। শেষ সময়ে বাস কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে ঘরমুখো মানুষদের। শুক্রবার রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে টিকিটের অপেক্ষা করতে দেয়া গেছে যাত্রীদের। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যাত্রীরা এই টার্মিনাল ব্যবহার করে যাতায়াতের জন্য। ঈদ উপলক্ষে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কোন অগ্রিম টিকিট বিক্রয় করা হয় না। সাধারণত যাত্রার দিন অনেকেই টিকিট কেটে বাড়ি ফিরেন। শুক্রবার সকাল থেকে অনেক যাত্রী টিকিটের অপেক্ষায় ছিলেন। টিকিট তো দূরের কথা যোগাযোগের জন্যও কোন কাউন্টার খোলা ছিল না বলে যাত্রীরা জানান। সিরাজগঞ্জগামী এসআই এন্টারপ্রাইজ, অভি এন্টারপ্রাইজ ও সেবা লাইনের সবগুলো কাউন্টারই বন্ধ দেখা গেছে। এসব বাসের চালকরাও কোন উত্তর দিতে পারেনি।

সোহরাব হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, সকাল ৯টায় এসেছি, দুপুর ২টা পর্যন্ত কোন টিকিট পাইনি। সব কাউন্টার বন্ধ দেখছি সকাল থেকে। কাউন্টার বন্ধ রেখে সিরাজগঞ্জের বাসের ২৫০ টাকার টিকিট ৮০০ টাকা করে বিক্রয় করা হচ্ছে। আমাদের এই রুটের বাসে অগ্রীম টিকিট বিক্রি হয় না, বাস ছাড়ার আগে টিকিট বিক্রি হয়। ব্ল্যাকে সব টিকিট বিক্রি হচ্ছে, একহাজার টাকা দিয়েও টিকিট পাচ্ছি না। সোহেল রানা নামে সিলেটের এক যাত্রী বলেন, ‘ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন টিকিট পাব, কখন গাড়িতে উঠব জানি না। সকাল ৯টার সময় বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, যেন টিকিট আগে পাওয়া যায়, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। টার্মিনালে এসেই দেখি বিশাল লাইন।’ এসআই এন্টারপ্রাইজের বাসের এক স্টাফ বলেন, ‘বাস মালিকরা যেভাবে নির্দেশনা দেয়, সেভাবেই বাসে যাত্রী উঠাই। টাকা তো বেশি হবে। কারণ আসার সময় খালি আসি। বাসের ব্যবস্থা করেই টিকিট ছাড়া হচ্ছে।’

এদিকে গাবতলী বাস টার্মিনালেও টিকিটের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের। শারমিন জাহান নামের এক যাত্রী বলেন, ‘মাগুরার টিকিটের জন্য সকাল ৯টায় সন্তানদের নিয়ে টার্মিনালে এসেছি। কিন্তু দুপুর ১২টা পর্যন্ত টিকিট পাচ্ছি না। বাচ্চাদের নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। কিভাবে বাড়ি যাব।’ অপর এক যাত্রী বলেন, ‘অতিরিক্ত টাকা দিয়েও টিকিট পাচ্ছি না। সব কাউন্টারই বলে টিকিট শেষ। এখন কি করি?।’ গোপালগঞ্জের যাত্রী সফিকুল ইসলাম বলেন, সকালে এসে ২৫০ টাকার টিকিট ৫০০ টাকা দিয়ে কেটেছি। এখন ১২টায় বাজে। গাড়ি কখন আসে বলতে পারছি না।

বরিশাল-সাতক্ষীরা-নড়াইল রুটে চলাচলকারী ঈগল পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ির সংকট নেই। তবে ফেরিতে দেড়ি হওয়ায় সঠিক সময়ে গাড়ি ছাড়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আগে থেকে এক দেড় ঘণ্টা সময় দেড়িতে আমরা যাত্রী গাড়িতে উঠাচ্ছি। আর ভাড়া সরকারি চার্টের বাইরে আমরা নিচ্ছি না। কোন সিট ফাঁকা নেই। সব টিকিট বুক। অতিরিক্ত গাড়ি দিলে সিট ফাঁকা হবে।

শুক্রবার কমলাপুর স্টেশন থেকে কোন ট্রেন ঠিক সময় ছেড়ে যায়নি। তাই শিডিউল বিপর্যয়ে কারণে চরম ভোগান্তি পাহাতে হয়েছে রেলপথের যাত্রীদের। এছাড়া ছাদে উঠা নিষেধ থাকলেও কেউ তা মানছে না। অপর দিকে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তে ঢাকা থেকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এতে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরে ফেরা মানুষের ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে উদ্ধারকারী ট্রেন গিয়ে বগিটি লাইনে তোলার পর বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এই দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও এই পথ দিয়ে ঢাকা থেকে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা অঞ্চলের ট্রেন চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। এর ফলে ঢাকা থেকে সব ট্রেন দেরিতে ছেড়ে গেছে।

বিমানবন্দর রেল স্টেশন পরিদর্শনকালে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোকে বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করে যেতে হয়। এই সেতু দিয়ে প্রতিটি ট্রেন অতিক্রম করতে ৩০/৪০ মিনিট সময় লাগে, প্রতিদিন ৩২টি ট্রেন এর ওপর দিয়ে চলাচল করে থাকে। সেই হিসেবে ট্রেনের সময় সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না। যমুনার উপর ২০২৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ হলে এই সমস্যার সমাধান হবে। তবে পূর্ব রেলের চট্টগ্রাম ও সিলেটের ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ঘরমুখো মানুষের চাপের কারণে ফেরিঘাটে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে যানবাহনের। পাটুরিয়া দৌলতদিয়া নৌ-রুটে দীর্ঘ ১৭ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। বৈরী আবহাওয়ায় কারণে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাই ফেরিঘাটে যানজটে চরম ভোগান্তি শিকার হতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষদের। শুক্রবার ভোর থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন ছিল। বিশেষ করে ছোট গাড়ির চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল। যানজটে আটকা পড়ে পরিবহন, প্রাইভেট কারসহ সব ধরনের যানবাহন। এর ফলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানবাহনের দীর্ঘ জট তৈরি। ধীরগতি যানবাহন চলাচল করে বলে স্থানীয়রা জানান।

ফেরিতে উঠার অপেক্ষা থাকা সাইফুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, ‘ভোর ৫টায় গাবতলী থেকে রওনা হয়েছি। সভার পর্যন্ত ভালোভাবে আসি। এ রাস্তায় থেমে থেমে যানজটে পড়তে হয়। মানিকগঞ্জ শহর পার হওয়া পর যানজট বেড়েছে। আমাদের পরিবহন শেষ দুই ঘণ্টায় আধা-কিলোমিটারের মতো এসেছে। অবস্থা যা আজ, ফেরিতে উঠতে পারব কি-না, সন্দেহ আছে। এমনও হতে পারে ফেরি পেতে পেতে রাত পার না হয়!’ আবদুর রহমান নামের যশোরের এক যাত্রী বলেন, ‘ভোর ৪টার দিকে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ফেরিতে উঠেছি দুপুর ১টায়। জীবনে কখনও এত দীর্ঘসময় ধরে যানজটে পড়িনি। সাধারণত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে ঘাটে আসি। আমার মনে হয় আজ (শুক্রবার) সবাই একসঙ্গে রওনা হয়েছে। এ কারণে এত জট। কাল(শনিবার) হয়তো যানজট কমতে পারে।

এ বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. সালাহ উদ্দীন বলেন, নদীতে তীব্র ¯্রােত থাকায় ফেরি চলাচলে সময় বেশি লাগে। তবে যে কটি ফেরি আছে, সেগুলো নিয়মিত চলাচল করলে যানবাহন পারাপারে সমস্যা হবে না।