এফআর টাওয়ারের জমিদার ও নির্মাণকারীসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

image

নকশা জালিয়াতী এবং অনুমোদন না নিয়ে বনানীর এফ আর টাওয়ার (ফারুক-রূপায়ণ টাওয়ার) ১৬ তলা থেকে ২৩ তলা নির্মানে দুর্নীতির অভিযোগে দুইটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২৫ জুন মঙ্গলবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলা দুইটি দায়ের করা হয় করেন উপ পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক। দুই মামলায় এফ আর টাওয়ারের জমির মালিক প্রকৌশলী সৈয়দ মোঃ হোসাইন ইমাম ফারুক (এস এম এইচ আই ফারুক), ডেভেলোপার কোম্পানী রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, এবং রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যাস, ও সরকারের সচিবসহ সহ ২৩ জনকে মামলার আসামি করা হয়েছে।

দুদকের ভারপ্রাপ্ত সচিব সারোয়ার মাহমুদ বলেন,এফ আর টাওয়ারের ১৫ তলা থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত অনিয়মের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। শুরুতে ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনেও মানা হয়নি নীতিমালা। ভবনটির দুইটি নকশা হাতে পেয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। একটি নকশায় ১৮ তলা ও অন্যটিতে ২৩ তলা দেখানো হয়েছে। একটি মামলায় পাঁচ জনকে এবং আরেকটি মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মুকুল ও ফারুক দুইটি মামলারই আসামি। তদন্তের প্রয়োজনে আসামিদের গ্রেফতার করা হতে পারে। ভারপ্রাপ্ত সচিব জানান, রাজউক ও গণপূর্তের কাছে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ভবনের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর খতিয়ে দেখা হবে। দুই মামলার অন্য আসামিরা হলো-কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর উল ইসলাম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন খাদেম ও কে এ এম হারুন, রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান, সাবেক অথরাইজড অফিসার-২ সৈয়দ মকবুল আহম্মেদ, সৈয়দ নাজমুল হুদা, সামছুর রহমান, সাবেক প্রধান ইমরাত পরিদর্শক মাহবুব হোসেন সরকার, সাবেক ইমারত পরিদর্শক আওরঙ্গজেব সিদ্দিকী, নজরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (এস্টেট) রেজাউল করিম তরফদার ও আ ই ম গোলাম কিবরিয়া, সাবেক পরিচালক (এস্টেট) শামসুল আলম ও আব্দুল্লা আল বাকী, সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট) মুহাম্মদ শওকত আলী, সাবেক সহকারী পরিচালক শাহ মো. সামসুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক (এস্টেট) জাহানারা বেগম ও মোফাজ্জেল হোসেন, সাবেক পরিদর্শক মেহেদউজ্জামান, নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক মুহাম্মদ মজিবুর রহমান মোল্লা ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. এনামুল হক। গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকান্ডের ২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলা জনিত মৃত্যুর অভিযোগে বনানী থানায় মামলা হয়। ওই মামলা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। এর মধ্যে ভবনটি নির্মানে অবৈধ সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠতে নকশা অনুমোদনে জমির মালিক এস এম এইচ আই ফারুক হোসেন ও রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, কাশেম ড্রাইসেল ব্যাটারির মালিক ও এফআর টাওয়ারের বর্ধিত অংশের মালিক তাসভির-উল-ইসলাম এবং রাজউকের সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

দুদক সূত্র জানায়, প্রথম মামলায় ভুয়া ছাড়পত্রের মাধ্যমে এফআর টাওয়ারের ১৯ তলা থেকে ২৩ তলা নির্মাণ, বন্ধক প্রদান ও বিক্রি করার অভিযোগে রুবিধির সাতটি ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় আসামিরা হলেন- এফআর টাওয়ারের মালিক এস এম এইচ আই ফারুক, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, কাসেম ড্রাইসেলের এমডি তানভীর-উল-ইসলাম, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান কে এ এম হারুন, সাবেক সদস্য মো. রেজাউল করিম তরফদার, সাবেক পরিচালক মো. শামসুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক মো. মোফাজ্জল হোসেন, সহকারী পরিচালক শাহ মো. সদরুল আলম, সাবেক প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. মাহবুব হোসেন সরকার, সাবেক ইমারত পরিদর্শক মো. আওরঙ্গজেব সিদ্দিকি, সহকারী অথরাইজড অফিসার মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক জাহানারা বেগম, সহকারী পরিচালক মেহেদউজ্জামান, নিম্নমান সহকারী মুহাম্মদ মজিবুর রহমান মোল্লা, অফিস সহকারী মো. এনামুল হক, বিসিএসআইআরের সদস্য (অর্থ) মুহাম্মদ শওকত আলী, সংসদ সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব আ ই ম গোলাম কিবরিয়া, জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুল্লাহ আল বাকি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সৈয়দ নাজমুল হুদা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সামছুর রহমান।

অপর মামলায় এফআর টাওয়ারের ১৫ তলা অনুমোদন থাকলেও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ লঙ্ঘন করে নকশা জালিয়াতির মাধ্যমে ১৮ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অভিযোগ আনা হয় হয়। এই মামলায় দন্ডবিধির চারটি ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন- এফআর টাওয়ারের মালিক এস এম এইচ আই ফারুক, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ূন খাদেম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান ও সাবেক অথরাইজড অফিসার সৈয়দ মকবুল আহমেদ।

মামলায় বলা হয়েছে, অভিযোগ অনুসন্ধানকালে দেখা যায় যে, আসামী সৈয়দ মোঃ হোসাইন ইমাম ফারুক (এস এম এইচ আই ফারুক) নিজ নামে ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন গুলশানের সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে (রেজিস্ট্রিকৃত ইজারা দলিল নং ৬৮১৫) তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) হতে বনানী বাণিজ্যিক এলাকার ৩২নং প্লটের ৮ কাঠা ৮ ছটাক ২২ বর্গফুট ভূমি ইজারা গ্রহণ করেন। ওই প্লটে ১৫তলা ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে নক্্শা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিকট তিনি ১৯৯০ সালের ২ অক্টোবর আবেদন করেন। অথরাইজড অফিসার, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকার স্মারক নং ৩/সি-১৪৩৪/৯০/২৫৩৫ ওই বছরের ৩০ অক্টোবর প্লটটিতে ১৫তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রদান করা হয়। এর পর ১৯৯৬ সালের ২৫ জানুয়ারী প্লটে ১৮ তলা ভবন নির্মার্নের সংশোধিত নক্্শা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেন। পরবর্তীতে অথরাইজড অফিসার, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকার স্মারক নং রাজউক/নঅঅ/ ৩সি-৩৯২/৯৬/৩২৫২ ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর তাকে প্রস্তাবিত ১৮তলা ভবনের সংশোধিত নক্্শা অবৈধভাবে অনুমোদনপত্র প্রদান করা হয়।

আসামী এস এম এইচ আই ফারুক ১৮তলা বিশিষ্ট ফারুক রূপায়ন টাওয়ার (এফ আর টাওয়ার) নির্মাণের জন্য ডেভেলপার কোম্পানী রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিঃ’র পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিয়াকত আলী খান মুকুল (এল এ মুকুল ) এর সাথে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তিপত্র ও সমঝোতা স্মারক সম্পাদন করেন। ২০০৩ সালে প্রথমে ১৮ তলা নির্মান করা হলেও উভয় পক্ষ ১৮ তলা থেকে ২৩ তলা নির্মানে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং অবৈধভাবে ১৮তলার স্থলে ২য় পর্যায়ে ২৩তলা বিশিষ্ট এফ আর টাওয়ার (বাণিজ্যিক ভবন) নির্মাণ করেন। ভবনের ১৯, ২০, ২১, ২২ ও ২৩তলা নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এস্টেট শাখা হতে কোন ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি ফি প্রদান ও নক্্শা অনুমোদন করা হয়নি। ভবনের বর্ণিত ফ্লোরসমূহ নির্মাণকালে নির্মাণ কার্যক্রম তদারকীর জন্য রাজউকের সংশ্লিস্টরা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তারা ছাড়পত্র ইস্যু, ফি জমা ও নক্্শা অনুমোদন ব্যতিরেকে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অননুমোদিত ভবন নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন। আসামী লিয়াকত আলী খান মুকুল এফ আর টাওয়ারের অবৈধভাবে নির্মিত ২০, ২১ ও ২২ তলার অফিস স্পেস বিক্রির জন্য ২০০৫ সালের ১৩ মার্চ কাসেম ড্রাইসেলস্ লিঃ’র পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসভীর-উল-ইসলামের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন(যার চুক্তি মূল্য ৫,৬৪,৯৯,০০০টাকা) । অবৈধ এসব ভবন বন্ধক রেখে কাশেম ড্রাইসেল এর মালিক ঋন নেন যাতে রাজউকের সংশ্লিস্টরা সহযোগিতা করে। ভবনের মালিকানা যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা ১৯ হতে ২৩তলার মালিকানার সঠিকতা যাচাই না করে জেনেশুনে জাল নকশার ভিত্তিতে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বন্ধক প্রদান ও ঋণ গ্রহণের ছাড়পত্র অনুমোদন প্রদানপূর্বক রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিঃ কে অবৈধভাবে সহায়তা করেছেন রাজউকের সংশ্লিস্টরা। তারা অবৈধভাবে নির্মিত ভবনের নকশা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গত ২৭ মার্চ আগুন লাগলে ফায়ার এলার্ম না থাকা, ফায়ার এক্সিট সিঁড়ি সরু থাকা, ফায়ার এক্সিট দরজা বন্ধ থাকা, জরুরী নির্গমন পথে প্রতিবন্ধকতা থাকায় এবং দরজার সামনে রুম তৈরী করে ভাড়া দেওয়ায় অগ্নিকান্ডের সময় ভবনের লোকজন দ্রুত বের হতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে সংঘটিত অগ্নিকান্ডে ২৫ জন মৃত্যুবরণ ও ৭৩ মারাত্মকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন।