দুই ট্রেনের সংঘর্ষ : নিহত ১৬

image

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দভাগে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা-সংবাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দভাগে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক। ১১ নভেম্বর সোমবার রাত ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর তূর্নানিশীতা সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসের একটি বগিতে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত করে। এতে উদয়নের ওই বগিটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি বগি। তূর্নানিশীতার ইঞ্জিনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনার জন্যে তূর্নানিশীতার চালককে দায়ী করছেন সবাই। উদয়ন তূর্নাকে পাস দিতে পাশের লাইনে সরে যেতে থাকে। শেষ দিকের ৩টি বগি বাকী থাকতেই ওই ৩ বগির মধ্যেরটিতে আচড়ে পড়ে তূর্নার ইঞ্জিন। এতে বগিটির সবই দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এই দুঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৮ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এই দুঘর্টনা তদন্তে রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃগর ট্রেন ঢাকাগামী তুর্নানিশিতা মঙ্গলবার ভোর রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওয়ানা করে। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জালিয়ে সংকেত দেন তূর্নানিশীতাকে (ট্রেন নম্বর ৭৪১)। অপরদিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৪) কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ পথে স্টেশন মাস্টার তাকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেয়। ওই ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ৬টি বগি ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার পর পেছনের ৩টি বগি মেইন লাইনে থাকতেই তূর্নানিশীতার চালক সিগনাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুত গতিতে এসে ওই ট্রেনের শেষ ৩টি বগির মধ্যেরটিতে আঘাত করে। এতে উদয়ন ট্রেনের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ওই বগির ১০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরও ৬ জন। আহত হন আরও একশ’ যাত্রী। কিন্তু ইঞ্জিন ছাড়া তূর্নানিশীতার কোন ক্ষতি হয়নি। ট্রেনের সব বগি অক্ষত অবস্থায় মেইন লাইনে ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়।

মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. জাকের হোসেন চৌধুরী বলেন, নিশিতা ট্রেনটি আউটারে মেইন লাইনে থামার সংকেত দেয়া হয়েছিল। উদয়ন ট্রেনটিকে মেইন লাইন থেকে ১ নং লাইনে আসার সংকেত দেয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে উদয়ন ট্রেন ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করছিল। এ সময় নিশিতা ট্রেনের চালক সংকেত অমান্য করে উদয়ন ট্রেনের ওপর ওঠে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই আশপাশের লোকজন ছুটে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। তার আগে সেখানে ছুটে আসেন রেল সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন। এর আগে ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে উদ্ধার কাজ তদারকি করেন জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। আখাউড়া ও লাকসাম থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ছুটে আসে দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেন উদ্ধারে। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় উদ্ধার কাজ। এদিকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে মরদেহগুলো স্থানীয় বায়েক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা হয়। এরপরই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সদস্যরা নিহতদের হাতের আঙুলের ছাপ নিয়ে তাদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ শুরু করে। খবর পেয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা ছুটে আসেন সেখানে। তারাও লাশ শনাক্ত করেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হচ্ছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের রাজারগাঁও গ্রামের মজিবুর রহমান (৫৫),অজ্ঞাত মহিলা (৩২), হবিগঞ্জ সদরের অজ্ঞাত মহিলা (৪১), অজ্ঞাত মহিলা, হবিগঞ্জ চুনারুঘাটের সুজন আহমেদ (২৪), হবিগঞ্জ সদরের ইয়াছিন আরাফাত (১২), রিপন মিয়া (২২), মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গলের গাজীপুর গ্রামের জাহেদা খাতুন (৩০), চাঁদপুর হাজীগঞ্জের কুলসুম বেগম (৩০), হবিগঞ্জের মদনমূড়কের আল আমিন (৩০), অজ্ঞাতনামা শিশু (৪), হবিগঞ্জ পৌরসভার আলী মোহাম্মদ ইউসুফ (৩২), হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের আদিবা (২) ও সোহামনি (৩), নোয়াখালী মসজিদপাড়ার রবি হরিজন (২৫), চাঁদপুরের ফারজানা (১৫)। তাদের মধ্যে দুপুরের দিকে জাহেদা বেগম (৪৮) ইয়াছিন আরাফাত (১২), আল-আমিন (৩৫)-এর লাশ হস্তান্তর করা হয়। বিকেল পর্যন্ত ১৫ জনের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিহতদের প্রত্যেককে রেল মন্ত্রণালয় ১ লাখ টাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়। আহতদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতাল, কসবা, আখাউড়া ও কুমিল্লা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মো. শাহআলম জানান- জেলা সদর হাসপাতালে ৪৪ জন, কসবা ও আখাউড়ায় ৪ জন এবং কুমিল্লা হাসপাতালে ১৩ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ৩ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। জেলা সদর হাসপাতালে মৃত্যু হয় ২ জনের।

কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএম হুমায়ুন কবির জানান, কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন মারা গেছে। তারা ২৯ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই-তিনজন ছাড়া বেশির ভাগই গুরুতর আহত।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় মন্ত্রী জানান, তাৎক্ষণিকভাবে তূর্নানিশীতার লোকোমোটিভ মাস্টার ও সহকারী মাস্টারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে উদয়ন এক্সপ্রেসের কোন ত্রুটি দেখছি না। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। ঘটনার তদন্তে রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেল সচিব মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন তারও আগেই ঘটনাস্থলেই পৌঁছান। তিনি সাংবাদিকদের জানান- রেলওয়ে পক্ষ থেকে ৪টি ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১টি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।

এদিকে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উদ্ধার কাজে সহায়তা করে। উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রাশেদুল কায়সার ভূঁইয়া জীবন বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে উদ্ধার কাজ করি এবং উভয় ট্রেনের যাত্রীদের জন্যে খাবার ও তাদের গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।

আহত যারা : আশুগঞ্জের তারুয়ার শুভ (৪৫), আখাউড়া গোলখারের বোরহান (১৭), চাঁদপুরের মাহিমা (৪), সিলেট বালাগঞ্জের রুবেল (৩৫), হবিগঞ্জের আলমগীর (৪০), নবীগঞ্জ মাঠবাজারের লোকমান (২২), আফসা (১৪), আসমা (২৪), ১ বছর বয়সী শিশু ওহাল, হবিগঞ্জ বলুলার আলমগীর (৪৩), বানিয়াচংয়ের আশিক মিয়া (৩২), সুব্রত (৪৫), মিম (৭), নাজমা (৩০), রেনু, চুনারুঘাটের রাজন (২৮), মাধবপুরের আনোয়ারা (৩৩), হবিগঞ্জ সৈয়দপুরের রায়হান (২০), বাগলখাল গ্রামের ধলাই (৬৫), খালিশপুর গ্রামের রাকিব (২৮), দীঘলবাশ গ্রামের হাসান আলী (৭০), নারায়ণপুর গ্রামের আবুল কালাম (৫২), চুনারুঘাটের জনি (২৪), সিলেট জৈন্তাপুরের আক্তার আলী (৬০), শ্রীমঙ্গল গাজীপুরের ইমন (১৮), সুমি (২১) কুমিল্লা দাউদকান্দির বোরহান (৪০), মনির (৪০), মঈন (৩৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়া ধোপখলার বৃষ্টি (১৪), বাকাইলের শাহবুদ্দিন (৫০), উত্তর কালিসীমার মিতু (২৫), সাহিদা (৪০), আখাউড়ার সুরাইয়া (২৬), নোয়াখালী মাইঝদির নারায়নপুর গ্রামের তারা সুরাইয়া (৩০), চাঁদপুর সাতরাশি গ্রামের রহিমা (৪৫), কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের আবুল কাশেম (৪০), ঢাকা গাজীপুরের ইমন (১৮), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের সৈকত (৩৫), আখাউড়া ধরখারের লিটন (৪২), নোয়াখালী সোনাপুর গ্রামের অলিউল্লাহ (৩৬)।

এ দিকে সংবাদের হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় যাত্রীবাহী দুই ট্রেনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে হবিগঞ্জের ১০ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন- হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি আলী মো. ইউসুফ (৩৫), সৈয়দাবাদ গ্রামের আজমত উল্লাহ ছেলে রিপন মিয়া (২২) বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের আইয়ূব হোসেনের ছেলে আল-আমিন (৩৫), চুনারুঘাট উপজেলার উলুকান্দি গ্রামের ফটিক মিয়া তালুকদারের ছেলে রুবেল মিয়া তালুকদার (২২), আহম্মদবাদ গ্রামের আবদুস ছালামের স্ত্রী পেয়ারা বেগম (৬২) পীরেরগাঁও গ্রামের সুজন মিয়া (২৪) ও তার সম্পর্কে খালা কুলসুমা বেগম (৪৫), নবীগঞ্জের বনগাঁও গ্রামের হারুন মিয়ার পুত্র নজরুল ইসলাম (২৬) ও বানিয়াচং উপজেলার টাম্মুলিটুলা মহল্লার সোহেল মিয়ার মেয়া আবিদা খাতুন (৮), সোহাগ মিয়ার মেয়ে সোহা আক্তার (২) তবে নিহত কুলসুমার বাড়ি চাঁদপুর জেলায় বলে অপর একটি জানিয়েছে। তারা সবাই উদয়ন ট্রেনের যাত্রী ছিলেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, হবিগঞ্জের যে কয়জন নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।

এদিকে নিহতের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আত্মী-স্বজনদের কান্নায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠছে। নিহত রুবেল একটি কোম্পানিতে চাকরি করত। পারিবারিক কাজে উদয়ন ট্রেনে করে চট্রগ্রাম যাচ্ছিল। নিহত সুজন লেখাপড়া করত। তার খালার সঙ্গে বেড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম যাচ্ছিল।