নুসরাতের খুনি জুবায়েরের বোরকা উদ্ধার

image

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনকারী ইফতেখার উদ্দিন রানাকে রাঙ্গামাটি সদরের টিঅ্যান্ডটি আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে শনিবার ভোর রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিলিং মিশনে অংশ নেয়া খুনিদের জন্য কেনা ৩টি বোরকার একটি উদ্ধার করা হয়েছে। রিমান্ডে থাকা কামরুন্নাহার মনি এবং জাবেদ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ফেনীর পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার উদ্দেশে আগুন দেয়ার ঘটনায় জোবায়ের সরাসরি জড়িত। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনাগাজী সরকারি কলেজের পেছনে খালে অভিযান চালিয়ে একটি বোরকা উদ্ধার করা হয়েছে; যেটি সে (খুনি জুবায়ের) ব্যবহার করেছিল। রিমান্ডে থাকা কামরুন্নাহার মনি জানায়, সোনাগাজী পৌরশহরের মানিক মিয়া প্লাজার একটি দোকান থেকে বোরকা কেনে সে।

পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম রেঞ্জের এসপি মোহাম্মদ ইকবাল টেলিফোনে সংবাদকে জানান, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার পর জোবায়ের নিজের ব্যবহার করা বোরকাটি কাশমির বাজার সংলগ্ন ঢালি খালে ফেলেছিল।

এসপি মোহাম্মদ ইকবাল জানান, ওই মিশনে অংশ নেয়া ৫ জনের মধ্যে ৩ জন পুরুষ হওয়ায় ওই ৩ জনকে যাতে কেউ না চিনে তার জন্য ৩টি বোরকা সংগ্রহের দায়িত্ব পড়েছিল কামরুন্নাহার মনির ওপর। এর মধ্যে ৪ এপ্রিল ২ হাজার টাকায় দুটি বোরকা কিনে বাড়ি নিয়ে যায় মনি। ঘটনার দিন সকালে ওই দুটি নতুন বোরকার সঙ্গে বাড়ি থেকে সে আরও একটি পুরাতন বোরকা মাদ্রাসায় নিয়ে আসে। আর বাড়ি থেকে কামরুন্নাহার মনি এবং উম্মে সুলতানা পপি নিজেদের বোরকা পড়ে আসে। সকালে আসার পর ৯টার আগেই সাইক্লোন শেল্টারের তৃতীয় তলায় বোরকাগুলো ৩ জনকে বিতরণ করে মনি। বোরকা পরে জোবায়ের, জাবেদ এবং শাহাদাত হোসেন শামিম ছাদে গিয়ে অবস্থান নেয়। তাদের সঙ্গে ছিল মনি। নুসরাত পরীক্ষা দিতে হলে ঢুকলে সেখান থেকে উম্মে সুলতানা মিথ্যা কথা বলে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে যায়। এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।

আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর কামরুন্নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি এবং জাবেদ পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়ে। শাহাদাত হোসেন শামিম এবং জুবায়ের পালিয়ে যায়।

পিবিআই সূত্র জানায়, এ হত্যাকাণ্ডে পত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ২০ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। সরাসরি জড়িত ৪ জনসহ মোট ৫ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া পরিকল্পনা, অর্থদাতা, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করাসহ বিভিন্নভাবে আরও ১০ জন জড়িত। নুসরাত হত্যা, অধ্যক্ষ সিরাজকে নির্দোষ প্রমাণ করে তার মুক্তি করানোর জন্য আন্দোলনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচসহ বিভিন্নভাবে আরও অনেকেই জড়িত।

পরিকল্পনাকারী ইফতেখার উদ্দিন রানাকে গ্রেফতার : ওই ঘটনায় পরিকল্পনকারী ইফতেখার উদ্দিন রানাকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। ২০ এপ্রিল শনিবার ভোর রাতে রাঙ্গামাটি সদরের টিঅ্যান্ডটি আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ২১ এপ্রিল রোববার রানাকে আদালতে হাজির করা হবে।

পিবিআই সূত্র জানায়, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য মাদ্রাসা হেফজখানার শিক্ষক আবদুল কাদেরের কক্ষে যে বৈঠক হয়েছে সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিল রানাও।

পপি, মনি ও জাবেদের জবানবন্দি : কামরুন্নাহার মনি এবং জাবেদ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে ফেনীর আদালতে। শনিবার দুপুরের পর থেকে দুই আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

পিবিআই’র একটি সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা স্বীকার করে বলেন, হত্যাকা-ের সময় পপি ও কামরুন্নাহার মনি নুসরাতকে ধরে রাখে। ওড়না দিয়ে হাত-পা বাঁধে জোবায়ের। জাবেদ গায়ে কেরোসিন ঢালে। ম্যাচের কাঠি দিয়ে গায়ে আগুন দেয় জোবায়ের। এর আগে শাহাদাত হোসেন শামীম কেরোসিন বহন করে আনে এবং হত্যার সময় নুসরাতের মুখ চেপে ধরে। নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে ভবনের মূল ফটকে পাহারায় ছিল ৫ জন। এর আগে এ ঘটনায় নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামিম, শরিফসহ ৪ জন জবানবন্দি দিয়েছিল।

৫ দিনের রিমান্ডে রুহুল আমিন : গ্রেফতার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের ৫ দিনের রিমান্ড হেফাজত মঞ্জুর করে আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহে আলম রুহুল আমিনকে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমনি চেয়েছিলেন।

এখন পর্যন্ত ৭ জনের স্বীকারোক্তি : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় শনিবার পর্যন্ত ৭ জনের জবানবন্দি আদালত রেকর্ড করেছে। এরা হলেন- নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম (৩ নম্বর), আবদুর রহিম শরীফ, হাফেজ আব্দুল কাদের (৭ নম্বর) ও উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা। শনিবার কামরুন্নাহার মনি এবং জাবেদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।