পেশা হারিয়ে মানবেতর জীবনে হাওর অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়

হাওর অঞ্চলের ২০ হাজারেরও বেশি জেলে পরিবারে জীবনে আসছে চরম দুর্দিন। পুরুষাক্রমিক মাছ ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসা এইসব জেলে পরিবার যেন বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। একদিকে মৎস্য সম্পদ হ্রাস অন্যদিকে ইজারাদার ও প্রভাবশালী লোকজনের শোষণ-অত্যাচার ইত্যাদিতে অতিষ্ঠ হয়ে ইতোমধ্যেই অনেক জেলে পরিবার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছে বলে জানা গেছে। হাওর অঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সুনামগঞ্জ জেলার সংযোগস্থল এই হাওর অঞ্চলে প্রকৃত ভাবেই অগণিত নদী, বিল-বাদাড়,হাওড়-বাঁওরে পরিপূর্ণ। এছাড়াও বর্ষায় সব মাঠ-ঘাট পথ পানিতে একাকার হয়ে পড়ে। আবার প্রকৃতি গত কারণে এ অঞ্চলের নদীর তীরবর্তী অথবা আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্যা জেলেপল্লী। পেশাগতভাবে এ অঞ্চলে ছোট মাঝারি কৃষক আর ক্ষেতমজুর, দিনমজুর মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এইসব কৃষক ক্ষেতমজুর, দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া লোকজন সারা বর্ষা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। অন্যদিকে একমাত্র বোরো ফসল এই অঞ্চলের প্রধান ফসল। যাতে হেমন্তের ছয়মাস কাজ করে। স্রোতবহ নদী এবং জলমহাল গুলির প্রতিটি বর্তমানে ইজারাদার এবং প্রভাবশালী লোকজনের করায়ত্ব।

জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এমনকি উচ্চ পর্যায় থেকে বাৎসরিক অথবা ত্রৈ-বাৎসরিক ইজার, দেয়া হচ্ছে বলে জেলেরা জানান। এইগুলো মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ইজারা পাওয়ার বিধান থাকলেও ইজারাদার আর প্রভাবশালী লোকজন নামে-বেনামে ইজারা নিয়ে যাচ্ছে বলে সচেতন জেলেরা জানান।

প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সমিতিতে ইজারা নেয়ার পুঁজি না থাকার ফলে ইজারাদার এবং প্রভাবশালীরা কোন কোন ক্ষেত্রে অমৎস্যজীবীদের ইজারাদারদের সদস্য করে সমিতি রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে বলে সূত্র জানান। নদীগুলো ইজারা পাওয়ার সাথে সাথেই জেলেদের মাছ ধরতে না দিয়ে এবং বাঁশ-কাটা দিয়ে নদীর নাব্যতা হ্রাস করা পাঁটি বাঁধ ও বিভিন্ন ধরনের অবৈধ জালে মাছ ধরা ইত্যাদি সরকারি নিষেধ অমান্য করে কোটি কোটি টাকা লাভবান হচ্ছে।

জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইজারাদারদের ইচ্ছা মাফিক রশিদ বিহীন নদীতে নির্ধারিত সীমানায় মাছ ধরতে হচ্ছে। তাও জেলেরা ধরা মাছ ইজারাদারদের তহবিলেই বিক্রি করতে হচ্ছে বর্ষায় ভাসান পানিতে নদীর সীমানা বহির্ভূত হাওড় খাল এমনকি আবাদি জমিতেও ইজারাদাররা জেলেদের মাছ ধরতে দিচ্ছে না বলে জানা যায়। ফলে জেলেদের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ইজাদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মারধর, জাল নৌকা ধরে নেয়ার এমনকি সুযোগে জেলেদের নামে মামলা ঠুকে দেয়া এ অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ঘটছে।

এদিকে ‘হাওরের পাশে বাংলাদেশ’-এর সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, রাজনৈতিকভাবে অমৎস্যজীবীদের কে মৎস্যজীবী সাজিয়ে তাদের কাছে জলমহালগুলোর ইজারার কারণে এবং তাদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে দেশের মৎস্য সম্পদ ও মৎস্যজীবীদেরও ধ্বংস করছে।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের বংশানুক্রমে জেলে পাহাড়পুরের ভূষণ দাস,সুবোধ দাস, সুনামগঞ্জের দিরাই, মজলিশপুরের হীরালাল দাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসির নগরের অনিল দাস, ঝন্টু দাস, সরাইলের দুলাল দাস,বানিয়াচং, সুশান্ত দাস, রতন দাস, সুনিল দাসসহ অষ্টগ্রামের রাজকুমার দাসসহ অসংখ্যা জেলেরা জানান তাদের দুর্ভোগের কথা।

এ ব্যপারে হাওড় অঞ্চলবাসী ঢাকা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রোটারিয়ান কামরুল ইসলাম বাবু বলেন, বেআইনীভাবে উন্মুক্ত নদীগুলো লিজ দেয়ার রাজনৈতিক প্রভাবে নদী দখল করে ঘেড় ও বাঁধ দিয়ে মাছ ধরছে প্রভাবশালীরা যেখানে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা কৃতদাস। এছাড়াও নদীর নাব্যতা হারানো এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিংএর ফলে মাছের অভয়ারন্য নষ্ট হয়ে যাওয়া অন্যতম কারন এবং তাতেই হাওড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি।