বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের লাশ দাফনে এলাকাবাসীর বাধা

image

চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পায়রা নদীর তীর বুড়িরচর এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। জনমনে আতঙ্ক, প্রশাসনের সংসয়, মিডিয়ার কর্মব্যাস্ততার মাঝে ২ জুলাই মঙ্গলবার ভোর রাত ৪-৩০ মিনিটে নয়ন বন্ড নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সকাল ৯টায় পুলিশ সুপারের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

বরগুনার বুড়িরচর গ্রামে ভোর রাতে গুলির শব্দ শুনে এলাকার মানুষ ঘটনাস্থলে যায়। তারা দেখতে পায় বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের রক্তাক্ত লাশ রাস্তায় পড়ে আছে। এলাকায় ভিড় জমতে থাকার মধ্যে লাশটি নিয়ে আসা হয় বরগুনা থানায়। হাজার হাজার লোক থানা প্রাঙ্গণ ও বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল এলাকায় একত্রিত হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। মিষ্টি বিতরণ করা হয় বিভিন্ন স্থানে। নয়ন বন্ড নিহত হলে রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ও মা ডেইজী আক্তার, রিফাত শরীফের বিধবা স্ত্রী মিন্নি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন। সকাল ৯টায় পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, সাব্বির আহাম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড পালিয়ে আছে গোপন সূত্রে এ খবর পেয়ে বরগুনার একদল পুলিশ মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামের পায়রা নদীর তীরে গেলে নয়নের সহযোগিরা পুলিশের দিকে গুলি ছোড়ে। পুলিশও তখন আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। কিছু সময় গোলাগুলি চলার পর নয়নের সহযোগিরা পালিয়ে যায়। পরে সেখানে নয়নের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় অভিযানে অংশগ্রহণকারী এএসপি শাহজাহান হোসেনসহ চার পুলিশ আহত হয়। আহত শাহজাহান ও মো. হাবিবুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য বরিশাল বিভাগীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি তাজা গুলি, তিনটি গুলির খোসা এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি আরও বলেন, নয়নকে জীবিত ধরতে পারলে ভালো হতো। তাহলে অন্য আসামিদের ধরতে সহজ হতো। তার পরও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অন্যান্য আসামিরাও পুলিশের নজরদারিতে আছে। সবাই খবর পাবেন। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপারের সঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারী দলের নেতা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিএম আশ্রাফউল্লাহ তাহের, সহকারী পুলিশ সুপার আমতলী সার্কেল মো. নাজমুল ইসলাম বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মাহামুদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলন

বরগুনায় গত ২৬ জুন সংঘটিত চাঞ্চল্যকর রিফাদ হত্যা মামলার ঘটনায় পলাতক আসামিরা বরগুনা থানাধীন পুরাকাটা ফেরি ঘাট এলাকায় আত্মগোপন করে আছে মর্মে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিএম আশ্রাফউল্যাহ তাহের, পাথরঘাটা সার্কেলের নেতৃত্বে বরগুনা থানার পুলিশ অদ্য ০২/৭/২০১৯ খ্রি: তারিখ ভোর অনুমান ৪-৩০ ঘটিকায় বরগুনা থানাধীন ৬নং বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামের পুরাকাটা ফেরিঘাট থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে চায়না প্রজেক্টের রাস্তাসংলগ্ন মজিদ মিলিটারির বাড়ির পূর্বপাশে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশের টের পেয়ে কতিপয় আসামিরা পুলিশকে লক্ষ করে এলোপাতারি গুলি ছোড়ে। অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ দল জান ও সরকারি মালামাল রক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। উভয় পক্ষের গুলিতে আসামিদের একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে পড়ে থাকে। তার সহযোগী অন্যান্যরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তার নাম সাব্বির আহাম্মেদ নয়ন বন্ড। আসামিদের সঙ্গে গোলাগুলির এক পর্যায়ে অভিযানে অংশগ্রহণকারী মো. শাহজাহান হোসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল বরগুনা, সদর সার্কেল এসআই (নি:) মো. হাবিবুর রহমান, বরগুনা থানা, এসআই (নি.) মো. মনিরুজ্জামান, ডিবি, বরগুনা, কনস্টেবল/৮৭৬, মো. হাবিবুর রহমান পুলিশ লাইনস বরগুনা আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যদের বরগুনা পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত মো. শাহজাহান হোসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল ও এসআই (নি.)/মো. হাবিবুর রহমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, শর্টগানের ২টি কার্তুজের খালি খোসা ও ৩টি দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

নয়ন বন্ড নিহত হবার খবরে বরগুনায় উচ্ছ্বাস

বিচারহীনভাবে কোন হত্যাকা- কোন সভ্য মানুষ মেনে নিতে না পারলেও নয়ন বন্ডের নৃসংসতার কাহিনী, ভুক্তভোগীদের বিবরণ, রিফাদ হত্যার চিত্র সংবাদ মাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার হলে সবাই যেকোন মূল্যে নয়ন বন্ড ও তার দু’সহযোগী রিফাত ফরাজী ও রিসান ফরাজীর গ্রেফতার কামনা করে। বিষয়টি সপ্তাহের কাছাকাছি এলে সবাই যেন অজানা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পরে। তারা বিচারহীনভাবে মৃত্য হলেও নয়ন বন্ডের পতন কামনা করে। নয়ন বন্ডের নিহত হবার ঘটনা শুনেই ভিড় করতে থাকে থানা, মর্গ ও ঘটনাস্থলে। তারা থানার সামনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সাংবাদিক ও পুলিশকে অভিনন্দন জানায়। থানার সামনে ও বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। বরগুনা হাসপাতালে নয়নের লাশের ময়নাতদন্তকালে শহর, গ্রাম-গঞ্জ থেকে হাজার হাজার লোক জড়ো হয় এই বলেÑ ‘জাহেলের’ চেহারা এক নজর দেখতে চায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। নয়ন নিহত হবার ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করে বরগুনা মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের বলেন, তারা বিচারবিহীন কোন হত্যাই সমর্থন করেন না কিন্তু নয়ন বন্ড হত্যায় সবাই খুশি। বরগুনা মহিলা পরিষদের সভাপতি নাজমা হালিম বলেন, এতবড় ঘটনা ঘটিয়ে নিরুদ্দেশ ছিল নয়ন বন্ড, পুলিশকে ধন্যবাদ তারা নয়নকে ধরতে পেরেছে। সদর রোডের দোকানদার আ. রহিম জানান, এখন ২য় ও তৃতীয় সন্ত্রসীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলেই হয়। বরগুনার নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, একটা প্রজন্ম কতগুলো ভুলের শিকার হলো এ ভুলগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে আরও নয়ন বন্ড তৈরি হবে কিছুই করার থাকবে না।

নয়ন বন্ডের লাশে থুথু ও জুতাপেটা

নয়ন বন্ড নিহত হবার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ শেফালী নামে এক মহিলাকে কলাপাতা আনতে বললে মহিলা রেগে যান। সে বলে, দেহেন অর রক্ত কুত্তায়ও খায় না অরে কলা পাতায় হোয়ান লাগবে কোন দুঃখে? সে তার পায়ের স্যান্ডেল দিয়ে নয়ন বন্ডের লাশে ৩/৪টা পিটান দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হাসপাতাল এলাকায় অসংখ্য নারী পুরুষ নয়ন বন্ডের লাশ দেখতে এসে লাশের গায় থুথু ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করে।

রিফাতের বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া

রিফাত শরীফের বাবা বরগুনা সদর উপজেলার বড় লবণগোলা গ্রামের দুলাল শরীফ ও রিফাতের মা ডেইজী বেগম তারা বুকের মানিক একমাত্র সন্তান রিফাত হত্যাকা-ের মূল হোতা নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মামলায় অন্যান্য মূল আসামিসহ সব আসামিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি নয়ন বন্ডের সহযোগিদের এইভাবে শাস্তি দেয়া হয় তবে রিফাতের আত্মা শান্তি পাবে।

নয়ন বন্ডকে গ্রেফতারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ। তিনি জানান, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া । তিনি আশা করেন, বাকি আসামিরাও শীঘ্রই গ্রেফতার হবে। তাদের বিশ্বাস ছিল আসামিরা ধরা পড়বেই। ডেইজী বেগম তার সন্তানের বিষয় সংশয় প্রকাশ করে বলেন, দেখবেন ওদের যেন কিছু না হয়। মেয়ে মেঘলা বলেন, ভয় লাগে ক্লাসে যেতে, ওদের সাঙ্গপাঙ্গরা এখনও গ্রেফতার হয়নি।

মিন্নির প্রতিক্রিয়া

রিফাত শরীফের বিধবা স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, স্বামীর হত্যাকারীরা গ্রেফতার হচ্ছে যেনে খুশি। নয়ন বন্ডেরা যেভাবে মানুষকে নির্যাতন করেছে এখন যেভাবেই হোক বিচার হচ্ছে। এ বিচারে মিন্নি খুশি। তবে মিন্নি ও তার ভাই ও বোনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। নয়ন বন্ডের লোকেরা তাদের ভয়ভিতি দেখিয়ে ছিল।

এ ঘটনায় রিফাত শরীফের বোন ইসরাৎ জাহান মৌ, মিন্নির বোন মেঘলা ও ভাই কাফির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে দুটি পরিবার। যদিও মিন্নির বাসায় পুলিশ পাহারা বসান হয়েছে কিন্তু পুলিশ কদিন পাহার দেবে এই নিয়ে মিন্নির পরিবারে সন্দেহ রয়েছে। তবে বিভিন্ন মহলে এখন যে ভীতি কাজ করে তা হলো নয়ন বন্ডের মারাত্মক দু’সহযোগী এখনও ধরা না পড়া। তারা দাবি করেছেন অনতি বিলম্বে রিফাত ফরাজী ও রিসান ফরাজীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

এ দিকে বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু মঙ্গলবার নিহত রিফাত শরীফের বাড়িতে য়ান। এ সময় তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং অন্য খুনিদের খুব তারাতাড়ি গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে সাংবাদিকদের জানান।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বরগুনা থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন নিহত নয়নের লাশ তার মামা মিজানুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন।