ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা

image

হঠাৎ পদ্মা নদীর ভাঙন ও প্লাবণে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে ডুবে যায় সড়ক-সংবাদ

দেশের বন্যা পরিস্থিতির দিনে দিনে অবনতি হচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন ভারতে বর্ষণ বেড়ে যাওয়া ফুলে-ফেঁপে উঠেছে বন্যাপ্রবণ নদ-নদীগুলো। প্রধান প্রধান সব নদীর পানিই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বন্যা প্রতিদিন বিস্তৃত হচ্ছে। শনিবার ৯টি জেলা হলেও ৫ জুলাই রোববার পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে ১৫টি জেলার নিম্নাঞ্চল।

পাউবো সূত্রমতে, সব প্রধান নদ-নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে, যা আগামী বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আজ পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টের পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। বর্তমানে বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও এ সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানির উচ্চতা।

তবে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক রয়েছে বন্যা কবলিত জেলা প্রশাসন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বন্যা কবলিত জেলার মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বিভিন্ন খামারে বেড়ে ওঠা গবাদিপশুর যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর রাখাসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খামারে বা কৃষকের গোয়ালে পালিত পশুগুলোকে এই মুহূর্তে যেকোন রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মুহূর্তে দেশের ১৫টি জেলা বন্যাকবলিত। এসব জেলার ওপর দিয়ে বহমান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলায় বসবাসকারী মানুষের ঘরবাড়িতে পানি উঠে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও মাছের ঘের।

বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করতে কন্ট্রোল রুম চালু করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, ১০১ পর্যবেক্ষণাধীন পানি স্টেশনের মধ্যে ১৭টিতে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর ৬১টি স্টেশনের পানি বাড়ছে, কমছে ৩৯টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে একটির। ধরলার কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম চালুর বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ জানান, বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের নম্বর হচ্ছে ০১৩১৮-২৩৪৫৬০।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, এখন যে পরিস্থিতি আছে তা আগামী ৪-৫ দিন প্রায় একই রকম থাকবে। এরপর আবার বৃষ্টি শুরু হলে পানি বাড়তে পারে।

এ বিষয়ে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান খান ও গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন জানিয়েছেন, আমরা সার্বক্ষণিক উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত বন্যা কবলিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এতে সহায়তা করছেন।

এদিকে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকরাও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, একদিকে করোনার ছোবল, অন্যদিকে বন্যা। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি। গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলের বন্যাদুর্গত মানুষরা।

ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি কমা অব্যাহত থাকলেও তিস্তা এবং করতোয়া নদীর পানি কিছুটা বাড়ছে। ফলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বিপদসীমার ৫২ সে. মি. এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ২২ সে. মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে ব্রহ্মপুত্রের পানি কমতে শুরু করায় নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দু’দিনে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি এবং সাঘাটা উপজেলার ৯টি পয়েন্টে প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। তবে ধীরগতিতে পানি কমতে থাকায় পানিবন্দী পরিবারগুলো চরম জনদুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গত শনিবার দিবাগত রাত থেকে পানি ফের বেড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দী পরিবারগুলো গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আশ্রয় কেন্দ্র এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত পরিবার গুলোর মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, কঞ্চিবাড়ি, শান্তিরাম, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তার নদীর বিভিন্ন চর প্লাবিত হয়ে কমপক্ষে ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অবিরাম বৃষ্টি এবং উজানের ঢলে আগাম বন্যা দেখা দেয়। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাপাসিয়া ইউনিয়নের রফিকুল ইসলাম জানান, চরের প্রতিটি বাড়িতে পানি উঠেছে। গত ৩০ জুন মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি অপরিবর্তিত রয়েছে। এছাড়া চরের বিভিন্ন প্রকার আবাদি জমি ডুবে গেছে। কাপাসিয়া ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন জানান তার ইউনিয়নের কমপক্ষে ৫ হাজার পরিবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আশ্রয় কেন্দ্র এবং বাঁধের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা নিবার্হী অফিসার কাজী লুতফুল হাসান জানান পানিবন্দী পরিবারদের মাঝে এ পর্যন্ত ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বরত অফিসাররা প্রতিনিয়ত পানিবন্দী পরিবারদের খোঁজখবর নিচ্ছে এবং ত্রাণ বিতরণ করছে।

জামালপুরে যমুনা নদীর পানি কমতে থাকায় বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে উঁচু এলাকার লোকজন। তবে নি¤œাঞ্চলে পানি থাকায় বাড়ি ফিরতে পারছে না বানভাসিরা। আর তাদের দুর্ভোগ কমাতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায় রবিবার সকালে যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।

৫ জুলাই জেলার ইসলামপুর উপজেলার কয়েকটি বন্যাকবলিত এলকা ঘুরে দেখা যায়- বন্যার পানি কমতে থাকায় বাড়ি ফিরছে উঁচু এলাকার সাধারণ মানুষ। তবে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে এখনও বন্যার পানি থাকায় বাড়ি ফিরতে পারছে না বন্যা কবলিতরা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে তারা। তাদের দুর্ভোগ কমাতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে জামালপুর জেলা প্রশাসন।

ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউনিয়নের পশ্চিম বামনা গ্রামের আবুল হোসেন মন্ডল জানান, তার বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তিনি। তবে তার এক স্বজন সুলতান মিয়া জানান, তার বাড়ি একটু নিচু এলাকায় হওয়ায় এখনও পানিতে তলিয়ে রয়েছে তার বাড়ি। কিন্তু পানি যদি এভাবে কমতে থাকে তবে খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরবেন বলে আশা করছেন তিনি। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তিনি খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন বলে জানান।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, এ পর্যন্ত যে ত্রাণ বরাদ্দ হয়েছে তা পর্যায়ক্রমে বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। এতে বন্যা কবলিতদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে বলে জানান তিনি।

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার নীচে নামলেও ধরলা নদীর পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। ধরলার পানি এখনও বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ও কৃষি বিভাগে। বন্যার পানিতে মারা গেছে ৮ জন। বিধস্ত হয়েছে ৪টি বিদ্যালয়। এছাড়াও ৮৮ জন ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

৫ জুলাই দুপুর ১২টায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে করোনা ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় এসব খবর উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। তিনি জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন বিভাগের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এসব খবর বেরিয়ে আসে।

মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান, সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমান উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু প্রমুখ। এ সময় জেলা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান কুড়িগ্রাম জেলায় একটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কুড়িগ্রামে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। এর রাশ টানার জন্য পিসিআর ল্যাব স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও সিভিল সার্জন জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩ হাজার ২২৯ জনের। ফলাফল পাওয়া গেছে ২ হাজার ৪৩৬জনের। মোট আক্রান্ত হয়েছে ২০৮ জন। সুস্থ হয়েছে ১১৬ জন। মারা গেছে ৪ জন। এর বাইরে বন্যার ফলে ৮ জন মারা গেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। এছাড়াও ৮৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে তিনি মতবিনিময় সভায় জানান।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কালিপদ রায় জানান, জেলায় ১৩৭ হেক্টর আয়তনের ৮৫৪টি পুকুর পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়েছে। এর ফলে ১৯০ টন মাছ ও ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকার পোনা ভেসে গেছে। প্রায় ২০ লাখ টাকার পুকুর পাড়ের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার।