মোমবাতি আর মোবাইলের আলোতে চলছে সেবাদান

image

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে আগুন লাগার পর রোগীদের বের করে আনা হয়। আগুন পুরোপুরি নেভানোর পর রাতেই চালু হয় হাসপাতালের কার্যক্রম। বৃহস্পতিবার রাতে চলে যাওয়া কয়েক শ‘রোগী ফিরেও আসে। শুক্রবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সবকিছু খতিয়ে দেখার পর আইসিইউ বিভাগ চালু করা সম্ভব হলেও এখনও চালু হয়নি হাসপাতালটির শিশু ওয়ার্ড। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন লাগার পর হাসপাতালে ভর্তি শিশু রোগীদের দ্রুত রেসকিউ (উদ্ধার) করে নিরাপদে স্থানান্তর করা গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওয়ার্ডটি। যে কারণে শিশু ওয়ার্ডটি চালু করা যায়নি। তবে অন্যান্য ওয়ার্ড চালু আছে। নতুন রোগীও আসছে। ফিরছে পুরাতন রোগীদের অধিকাংশই। তবে এখনও বেশ কিছু বিভাগে বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু হয়নি। কোথাও নেই ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের সংযোগও।

শনিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত সেখানে ধোয়া-মুছার কাজ চলছে। স্টোর রুম এখনও পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নতুন নতুন রোগীদের আসতে দেখা যায়। পাশাপাশি পুরাতন রোগীদের ভিড় জমেছে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের কর্মকর্তাদের কক্ষে। আগুনে পুড়ে যাওয়া কিংবা জিনিসপত্র ফিরে পাওয়া যাবে কি না- তাই খোঁজ চলছে সেখানে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালটির গেটের পাশেই চেয়ার-টেবিল পেতে ডেক্স বসানো হয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন একাধিক চিকিৎসক ও নার্স। এখান থেকেই পুরাতন রোগীদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে চিকিৎসার জন্য ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, আমাদের হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের দিন ১১৭৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে পুরুষ রোগী ৫২৬ জন, নারী ৫৭৬ জন ও শিশু ৭২ জন। আগুন লাগার আধাঘণ্টার মধ্যে আমরা ছাত্র, চিকিৎসক, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, পুলিশ সদস্য, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সবার সহযোগিতায় রোগীদের বের করে নিয়ে আসি। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে অন্যান্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অগ্নিকান্ডে কেউ হতাহত হননি উল্লেখ করে তিনি জানান, অগ্নিকান্ডের রাতেই সীমিত পরিসরে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করা হয়। শুক্রবার পুরোদমে শুরু হয় সেবাদান। শুক্রবার সকাল থেকেই পুরাতন রোগীরা ফিরছেন। শনিবার সকালের তথ্য মতে, ৮৯১ জন রোগী রয়েছে, এরমধ্যে নতুন রোগী হবে ১০০, বাকি সবই পুরাতন রোগী।

শিশু ওয়ার্ড সম্পর্কে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. কে এম মামুন মোর্শেদ বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ সার্বিক খোঁজ-খবর ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চালু করা হয় আইসিইউ বিভাগ। এখন সেখানে ৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আইসিইউ চালু করা গেলেও চালু করা যায়নি শিশু বিভাগটি। কারণ অগ্নিকান্ডে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ বিভাগ। পাশাপাশি এখনও ধোঁয়া রয়েছে, দুর্গন্ধও বের হচ্ছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু করা যায়নি। যথা সম্ভব আমরা চেষ্টা করছি শিশু বিভাগের কার্যক্রম চালুর। অন্যদিকে শুক্রবার সকাল থেকেই চালু হয়েছে ব্লাড ব্যাংক। তবে সেখানেও নেই বৈদ্যুতিক সংযোগ। মোমবাতি আর মোবাইলের আলোতে চলছে সেবাদান। সেখানে কর্তব্যরত এক নারী কর্মকর্তা বলেন, এখানে বিদ্যুতের সংযোগ না থাকায় ব্লাড-সংক্রান্ত সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। ব্লাডের ক্রস ম্যাচিং শেষে মাইক্রোসকপি স্লাইড দেখতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে তা সম্ভব হয় না। তবে আজই বৈদ্যুতিক সংযোগ আসার কথা রয়েছে। বিদ্যুৎ আসলে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা হবে।

হাসপাতালের ১নং ওয়ার্ডের ৮৫নং সিটে ভর্তি ছিলেন মোহাম্মপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার আব্দুল গণি খাঁ। অগ্নিকান্ডের রাতে স্ত্রী ফাতেমা বেগম স্বামীকে নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। তবে আগুন নিভে যাওয়ার পর শুক্রবার সকালে ফের হাসপাতালে পূর্বের বেডে ভর্তি হন। ফাতেমা বলেন, আগুন নিভে যাওয়ায় ভয় কেটে গেছে। অনেকেই ফিরছে। আমাদের যা অবস্থা তাতে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির টাকা নাই। তাই এখানেই ফেরা।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মদ খান জানান, তৃতীয় তলার স্টোর রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত। সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দ্বিতীয় ও নিচতলায়। ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে শুক্রবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমারকে প্রধান করে সাত সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।