রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত করতে তৎপর বিশেষ মহল 

image

সরকার ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে শরণার্থী সমস্যা দীর্ঘায়িত করতেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল রোহিঙ্গা স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের দাবি- নদী উত্তাল থাকা ও কোন পথে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে আনা হবে, ওই সিদ্ধান্ত ঠিক না হওয়ায় শুরু হয়নি রোহিঙ্গা স্থানান্তর। অন্যদিকে রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, স্থানান্তরের জন্য রোহিঙ্গাদের তালিকা সম্পন্ন করতে পারেনি সরকার। রোহিঙ্গাদের অনিচ্ছার কারণেই শুরু হচ্ছে না ভাসানচরে স্থানান্তর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন সংবাদকে বলেন, স্থানান্তর শুরু না হওয়ার পেছনে ভাসানচর সম্পর্কে গণমাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের অপপ্রচার, রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিয়তা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশেষভাবে কাজ করেছে। তবে এই পেছনের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বার্থান্বেষী রাজনীতি জড়িত থাকতে পারে। এই স্বার্থান্বেষী মহল চাইছে সরকার ও রোহিঙ্গাদের দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখে রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত করতে- যাতে ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে রাখা যায়।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে গত ৪ মার্চ এক বৈঠকের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে ২৩ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে। পুনর্বাসনের জন্য ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে চরের ভূমি উন্নয়ন ও তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, থাকছে ১ হাজার ৪৪০টি ব্যারাক হাউস। আর থাকবে ১২০টি শেল্টার স্টেশন, মসজিদ, দ্বীপটির নিরাপত্তার জন্য নৌবাহিনীর অফিস ভবন ও কর্মকর্তাদের জন্য বাসভবন। অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় থাকবে নলকূপ ও পুকুর। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য সুরক্ষা, জরুরি আশ্রয়, খাদ্য, পুষ্টি, পানীয় জল, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, মনোসামাজিক সহায়তা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

প্রত্যাবাসন বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সংবাদকে বলেন, সরকার ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কিছু রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসাচরে স্থান্তরের একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। তবে রোহিঙ্গাদের সেখানে স্থানান্তর করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

সরকার প্রায় এক বছর আগে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখানে নৌবাহিনীর সহায়তায় অবকাঠাম নির্মাণ শুরু করে। তখন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এর বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, ভাসানচর মানুষের বসবাসের জন্য অনুকূল নয়। তাছাড়া ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের মধ্যেমে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকারের দাবির মুখে জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচরে নির্মিত অবকাঠামো ঘুরে দেখে। ক্যাম্পটি নির্মাণে গ্রিল ব্যবহার করায় ঘরগুলোকে কারাগারের সঙ্গে তুলনা করেন তারা। তবে সম্প্রতি সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ। তাদের দাবি- ভাসানচরে স্থানান্তরের কাজটি যাতে রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে না হয়। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সহযোগিতা নিয়েই রোহিঙ্গাদের একাংশকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের আগ্রহ না থাকায় ১৫ এপ্রিল রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর সম্ভব হয়নি।

জামতলী কুতুপালং ক্যাম্পের মাঝি মাস্টার আবদুর রহিম সংবাদকে বলেন, ক্যাম্পের একজন রোহিঙ্গাও নোয়াখালীর ভাসানচরে যেতে আগ্রহী নয়। এ জন্য ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য তৈরি করতে আসা এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকাতেও কেউ নাম দেননি। স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করলে রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে দেন।

টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দার আবদুল মালেক বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরা মারামারি করে এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণ ওই মারামারি থামাতে গেলে রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের ওপর হামলা করে। এ অবস্থায় আমাদের চুপ করে রোহিঙ্গাদের বিশৃঙ্খলা দেখা ছাড়া উপায় নেই।

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর সম্পর্কে নোয়াখালী জেলার জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস সংবাদকে বলেন, ১৫ এপ্রিলকে একটি সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ধরা হয়েছিল। তবে কোন রুটে রোহিঙ্গাদের এখানে আনা হবে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঠিক না হওয়া এবং নদী যথেষ্ট উত্তাল থাকায় ১৫ এপ্রিল স্থানান্তর শুরু হয়নি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য আমরা স্থল ও জলপথের কথা ভাবছি। এর মধ্যে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ভাসানচরের একটি জলপথ রয়েছে। এছাড়া কুতুপালং-চট্টগ্রাম-নোয়াখালী-চেয়ারম্যান ঘাট-ভাসানচর রয়েছ। এই স্থলপথেও চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ভাসানচর পর্যন্ত ৩ ঘণ্টার জলপথ রয়েছে। সব দিন বিবেচনা করেই রোহিঙ্গা স্থানান্তর শুরু করা হয়নি। কবে রোহিঙ্গা স্থানান্তর শুরু হতে পারে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাসানচরে আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ। তবে আগামী ৩ থেকে ৪ মাস নদী এ রকম উত্তাল থাকবে। তাই মোটামুটি আক্টোবরের আগে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে না। যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে, তাদের তালিকা জেলা প্রশাসক তন্ময় দাসের হাতে পৌঁছেছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো আমার হাতে রোহিঙ্গাদের কোন তালিকা এসে পৌঁছায়নি।

রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য তালিকা তৈরি করা হয়েছে কিনা প্রশ্নের জবাবে কক্সবজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন সংবাদকে বলেন, তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব প্রত্যাবাসন বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালামের। তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবেন।