লক্ষাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত তিন লাখ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত

image

চরফ্যাশন : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর-সংবাদ

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে সারাদেশে অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে ১২ জনই গাছ ও ঘরচাপায় মারা গেছেন। ১০ নভেম্বর রোববার ভোরে আঘাত হানা এ ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক কাঁচা-পাকা ঘর-বাড়ি আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে প্রায় ১৭ হাজার মাছের ঘের, উপড়ে গেছে বহু গাছপালা, বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে অনেক গ্রাম। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছেন প্রায় অর্ধকোটি (৫০ লাখ) মানুষ। অবশ্য সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে উপকূলীয় এলাকা রক্ষা পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বুলবুলে সুন্দরবনসহ সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানতে আরও বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে। আক্রান্ত এলাকায় উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজ চললেও ত্রাণের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম বলে অভিযোগ করেছেন উপকূলবাসী।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সূত্র এবং আমাদের প্রতিনিধিদের তথ্যমতে, এক শিশুসহ ১১ জন মারা গেছে রোববার। দু’জন মারা গেছে ৯ নভেম্বর শনিবার। একজন ছাড়া অন্যরা গাছ ও ঘরচাপায় মারা গেছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গাছ চাপা পড়ে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় আলমগীর (৪০) ও দাকোপ উপজেলায় প্রমিলা মণ্ডল (৫২) মারা গেছেন; বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় হীরা বেগম (২৫) এবং রামপাল উপজেলায় কিশোরী সামিয়া (১৫) মারা গেছে। বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় আশালতা দেবী (৬৫), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় হামিদ কাজী (৬৫) এবং পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় ননি মণ্ডল (৫৫) মারা গেছেন। বরগুনা সদর উপজেলার হালিমা খাতুন (৭০) আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শরীয়তপুরে মারা যাওয়া দু’জন হলেন, নড়িয়া উপজেলার আলী বক্স ছৈয়াল (৬৮) ও ডামুড্যা উপজেলার আলেয়া বেগম (৪৮)। সোমবার (১১ নভেম্বর) বেলা তিনটার দিকে বসতঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়লে তারা মারা যান। এ ছাড়া গাছ চাপা পড়ে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার সাথী বৈদ্য (৬) ও ছাকেন হাওলাদার (৭০) এবং সদর উপজেলার মাজু বেগম (৮৫) মারা যান।

সোমবার আবহাওয়া অধিদফতরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ লঘুচাপে পরিণত হয়ে বর্তমানে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করছে। লঘুচাপের বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়া সাধারণত শুষ্ক থাকতে পারে। সেই সঙ্গে আকাশ মেঘলাসহ দেশের বরিশাল, চট্রগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কয়েক জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সারাদেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস- বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস জানায়।

সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট উষ্ণম-লীয় ঝড় মাতমো গত অক্টোবরের শেষে ভিয়েতনাম হয়ে স্থলভাগে ওঠে আসে। সেই ঘূর্ণিবায়ুর অবশিষ্টাংশই ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে আবার নিম্নচাপে রূপ নেয়। বার বার দিক বদলে নিম্নচাপটি আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে বুধবার রাতে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তখন এর নাম দেয়া হয় বুলবুল।

রোববার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে আহত হয়েছেন ৩০ জন। এ সময় চার থেকে ৫ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এখনও বাংলাদেশেই অবস্থান করছে। তবে সেটা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে। আর সোমবার আমরা একটা রৌদ্রোজ্জ্বল দিন পেয়েছি।

তিনি বলেন, ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে আমরা সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম। ৫ হাজার ৫৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ লাখ ৬ হাজার ৯১৮ জনকে আমরা সফলভাবে সরিয়ে নিতে পেরেছি। নিরাপত্তা দিতে পেরেছি।

সোমবার ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সুন্দরবন বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করছে। সুন্দরবনের প্রতি কেউ যেন অযত্ন অবহেলা করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে বলব। আমরা চাই সুন্দরবনের যেন আরও যত্ন নেয়া হয়, নতুন নতুন গাছ লাগিয়ে বনকে শক্তিশালী করা হয়। সুন্দরবনের কারনেই বুলবুল আমাদের তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। এটি রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করেছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের ২১ জেলার ৯৫ হাজার কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মইন উদ্দীন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনও ৫০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ সেবার বাইরে রয়েছেন। অনেক স্থানে সঞ্চালন লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) সূত্র জানায়, ঝড়টি আঘাত হানার পর থেকে উপকূলীয় নয়টি জেলার অন্তত ২৫ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে এসব জেলায় ৭০ হাজার কিলোমিটার লাইনে বিদ্যুৎ বিতরণ বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি, ট্রান্সফরমার ও ইনস্যুলেটরসহ নানা যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আনুমানিক সাত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক চন্ডী দাস কুন্ড বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ১৬ জেলায় ২ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিশ্চিত হতে আরও ২-৩ দিন সময় লাগতে পারে। কোন কোন স্থানে ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকলে খেসারি মরে যাবে। আবার ছয়-সাত দিন যদি পানি জমে থাকে তাহলে ধান গাছও মরে যাবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে সারাদেশে এবার ৬৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ঝড়ে আক্রান্ত ১৬ জেলায় চাষ হয়েছে ১৬ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমিতে।

মৎস্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রমজান আলী বলেন, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক একটা চিত্র পাওয়া গেছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি বলেই মনে হচ্ছে। এসব জেলার ১৪ হাজার ৮৫৮টি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব খামারের আয়তন ৯৩০০ হেক্টর। তবে আমাদের প্রতিনিধিদের তথ্যমতে প্রায় ১৭ হাজার মাছের ঘের ক্ষতি হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি ৭ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে রূপান্তরিত হয়। এরপর ৮ নভেম্বর ৪ নম্বর সর্তকতা সংকেত দেয়া হয়। ৯ নভেম্বর সকাল ৬টায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেয়া হয়। এটা ৯ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে ৮৮ দশমিক ১ দ্রাঘিমাংশ এবং ২১ দশমিক ৩ অক্ষাংশ বরাবর আসার সময় পশ্চিম বাংলায় আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঝড়টি দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন দিয়ে প্রবেশ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বুলবুলের বাতাসের গড় গতিবেগ ৪০ থেকে ১১০ কিলোমিটার।

আমাদের প্রতিনিধিরা জানান,