শব্দ ও বায়ু দূষণে জনজীবন বিপর্যস্ত করে বালুর অবৈধ উত্তোলন

image

রাজিবপুর (কুড়িগ্রাম) : এভাবেই ধুলা-বালি উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বালুবাহী ট্রাক-সংবাদ

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর ও রৌমারীর উপজেলার শত শত বালু ভর্তি ট্রাক্টর (কাকড়া) ও ট্রলির চলাচলের বিকট শব্দ দূষণ ও বাতাসে ধুলাবালি মিশে বায়ু দূষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন শতশত ট্রাক্টর উপজেলার পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদের পার কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন এলাকার পুকুর ও বসতভিটা ভরাট করছে। এতে পানি নিষ্কাশনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাক্টরের বিকট শব্দের ও হর্ণে রাস্তার উভয় পাশের বসতবাড়ির লোকজন চরম ভাবে দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন।

বাগুয়ারচর গ্রামের (অবসরপ্রাপ্ত) শিক্ষক আবু হোসেন বলেন, প্রতিদিন ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত একটানা বালু ভর্তি ট্রাক্টরগুলো অবিরাম দ্রুত গতিতে চলতে থাকে। উপজেলার প্রায় দু’শতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারে না। দ্রুতগতির ট্রাক্টরের ভয়ে শিক্ষার্থীরা সর্বদা দুর্ঘটনার আশঙ্কায় রাস্তা পাড়াপাড় হয়ে থাকে। বিশেষ করে রৌমারী সরকারি ডিগ্রি কলেজ পাড়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের একাএকা স্কুলে পাঠাতে ভয়ে থাকতে হয় অভিভাবকদের। ফুলুয়ারচর গ্রামের মো. সিরাজলি ইসলাম বলেন, মসজিদের নামাজিরা বিকট শব্দে ঠিকমতো নামাজ আদায় করতে পারে না। প্রতিদিন রৌমারী হতে চিলমারী-কুড়িগ্রামের যাত্রী ও উপজেলার পরিষদগামী, হাটুরে হাজার হাজার মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত রাস্তা চলাচল করতে হয়। বালু ভর্তি ট্রাক্টরগুলো এত বিকট শব্দে চলে যে আশপাশের বসতবাড়ির ছোট-ছোট শিশুরা দিনের বেলায় ঘুমোতেও পারে না। বিকট শব্দ শুনে শিশুরা কান্না ও ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠে। ট্রাক্টরের বিকট শব্দে দূষণ ও বালুতে রাস্তার পাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যার ফলে বসতবাড়ির লোকজন শ্বাসকষ্টজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না। প্রচণ্ড শব্দে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিসিয়ালি কাজকর্মে ব্যাহত হচ্ছে। বিকট শব্দে অসুস্থ ব্যক্তিরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অতিমাত্রায় অবৈধ গাড়ি চলাচলে সরকারের গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট ভেঙ্গে গিয়ে যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

কুটিরচর গ্রামের পথচারী লিটন মিয়া জানান, ট্রাক্টরের ভয়ে রাস্তায় ঠিকমতো যাতায়াত করা যায় না। ট্রাক্টর এলেই রাস্তা ছেড়ে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনভিজ্ঞ ও কম বয়সী চালকেরা পাল্লা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা, বসতবাড়ি ও জানমালের ক্ষতি করছে।

জাউনিয়ার চর পূর্ব জালচিড়ার নদী ও খাল থেকে সকাল-সন্ধ্যা ট্রাক ভর্তি মাটি নিয়ে বালিয়ামারী-বটতলা ও রাজিবপুরের প্রধান সড়কটি ব্যস্ত রাখে। ফলে স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষকে পোহাতে হয় দুর্ভোগ। বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ স্কুল সময় ও ছুটির সময় ট্রাকগুলো বন্ধ থাকলেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। কৃষিবান্ধব সরকারের ভর্তুকি দেয়া ট্রাক্টর জমি চাষাবাদ না করে মালবাহী হিসেবে ব্যবহার করায় প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। কেড়ে নিয়েছে কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীসহ বেশকিছু জনপ্রাণ। এ নিয়ে একাধিকবার মিছিল মিটিং ও মানববন্ধনসহ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হলেও এর কোন প্রতিকার হয়নি। একদিকে যেমন শব্দ দূষণ অন্যদিকে জনপ্রাণ কেড়ে নেয়ায় এ আত্মঘাতী যন্ত্রটি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, নাকমুখ দিয়ে ধুলাবলি প্রবেশ করে সর্দিকাশি, শ্বাস কষ্টের মতো নানা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল ইমরান সাংবাদিকদের বলেন, মাসিক সমন্বয় সভায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতয়াতের জন্য পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ট্রাক্টর (কাকড়া) গাড়ি চালানো বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরদিকে চর রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।