শ্রমিক নিহতের ৯ মাস পর ফের টোল আদায় বর্ধিত হারে!

image

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) : নতুন করে টোলবক্স বসিয়ে এভাবেই আদায় করা হচ্ছে টোল। সেতুর মাঝে টোলবাক্স বসায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে সেতুটি -সংবাদ

বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুতে টোল আদায় ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ফের বর্ধিত হারেই টোল আদায় শুরু করেছে ইজারাদার কতৃপক্ষ। এতে পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষোভ বিরাজ করেছে এবং চালকরা বর্ধিত টোলের চাপে ফের বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। গতবছর সেতু টোল মুক্তর আন্দোলনে পরিবহন শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহত হয়। এসময় সেতু টোল মুক্তর দাবীতে পরিবহন শ্রমিক, মালিক ও চালকেরা বিক্ষুব্ধ আন্দোলনে নামলে স্থানীয় জন প্রতিনিধিরের চাপে গত বছর ২৬ অক্টোবর থেকে সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্দেশে টোল আদায় বন্ধ রাখে । গত ১ জুলাই থেকে পুনরায় বর্ধিত হারে টোল আদায় শুরু করে ইজারাদার। এছড়াও সেতুর মাজখানে টোল ঘর বসানোর কারনে সবসময় সেতুর উপর পরিবহনের যানজট লেগে থাকে এতে সেতুর প্রচন্ড ক্ষতি হবার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, ১৯৮৮ সালে তৈরী হয় বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু (চীনমৈত্রী সেতু)। রাজধানীর পোস্তগোলা ও কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু (পোস্তগোলা সেতু)। সেতুটি চালু হওয়ার পর কেটে গেছে ৩১ বছর। এত বছর পরও সেতুটি টোলমুক্ত না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরদিকে ২০০১ সালে নির্মিত বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু (বাবুবাজার সেতু) ২০১৩ সালের পর থেকে টোলমুক্ত ভাবে পরিবহন চলাচল করছে।

স্থানীয় সূত্র জনায়, বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুটি টোলমুক্ত করার দাবিতে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে পরিবহন শ্রমিকরা। এরই মধ্যে ২০১৫ সালে নতুন টোলনীতি অনুসারে পোস্তগোলা সেতুর টোল আদায়ের হার পূর্বের তুলনায় কয়েকগুন বৃদ্ধি করা হয়। এতে ওই সময় ক্ষোভে ফুঁসে উঠে পরিবহন শ্রমিক, মালিক, ও চালকেরা। বর্ধিত হারে টোল দিতে তারা অস্বীকার করে এবং সেতু টোলমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনে নামে। শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে তখন সেটা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর থেকে নতুন ইজারাদার বর্ধিত হারে টোল আদায় শুরু করলে পরিবহন শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পুনরায় আন্দোলনে নামে তারা। ২৬ অক্টোবর আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয় এক শ্রমিক প্রান হারান। এ ঘটনার পর সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্দেশে টোল আদায় বন্ধ রাখে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আলম শিপিং লাইনস। কিন্তু প্রায় ৯ মাস বন্ধ থাকার পর গত ১ জুলাই থেকে পুনরায় বর্ধিত হারে টোল আদায় শুরু করে ইজারাদার। এ নিয়ে নতুন করে ক্ষোভে ফুঁসছে পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু টোলমুক্ত আন্দোলনের সভাপতি ও শ্রমিকলীগ নেতা এমদাদুল হক দাদন জানান, যেখান আমরা টোল ফ্রি করার দাবি জানাচ্ছি, সেখানে উল্টো টোল আরও বাড়ানো হয়েছে। এনিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে কয়েক মাস আগে এক শ্রমিক নিহত হয়। বন্ধ রাখা হয় টোল আদায়। কিন্তু ৯ মাস পর বর্ধিত হারেই পুনরায় টোল আদায় শুরু করেছে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, যে কারনে শ্রমিককে রক্ত দিতে হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন না হলে টোল আদায় পুনরায় শুরু করা দু:খজনক। আমরা অবিলম্বে বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু টোলমুক্ত করার দাবি জানাই।

পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ সালে পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন টোল অনুযায়ী ট্রেইলার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা, হেভি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪০ টাকা, মাঝারি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২৫ টাকা, মিনি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা, মিনিবাস/ কোস্টার ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা, প্রাইভেট কার ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা, থ্রি হুইলার যানবাহন আগে টোল ফ্রি থাকলেও নতুন টোল ধার্য করা হয় ২৫ টাকা। একইভাবে টোলমুক্ত থাকা মোটরসাইকেল ও রিকশা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ির টোল ধরা হয় যথাক্রমে ১৫ ও ১০ টাকা। কিন্তু ওই সময়ে শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বর্ধিত হারে টোল আদায় না করে পূর্বের হারে টোল আদায় অব্যাহত রাখে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। যা অব্যাহত ছিল ২০১৮ সালে অক্টোবর পর্যন্ত। ওই বছরের ২০ অক্টোবর থেকে নতুন ইজারাদার বর্ধিত হারে টোল আদায় শুরু করলে শ্রমিক আন্দোলনের কারনে এক শ্রমিক নিহত হলে টোল আদায় বন্ধ রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুর ইজারাদার মোহাম্মদ আলম জানান, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩ বছরের জন্য ২২ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সেতুর টোল আদায়ের ইজারা পান তিনি। সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে নির্ধারন করা হারে তিনি টোল আদায় শুরু করলে ২৬ অক্টোবর শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত হয়। তখন সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্দেশে তিনি টোল আদায় বন্ধ রাখেন। কিন্তু সম্প্রতি সওজ থেকে অনুমোদন দেয়ায় তিনি গত ১ জুলাই থেকে সরকার নির্ধারিত হাতে টোল আদায় করছেন।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, ৩১ বছরেও বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু টোলমুক্ত না হওয়ায় আমরা অসন্তুষ্ট। অথচ সেতু নির্মানের চুক্তি অনুযায়ী ১৩ বছর আগে এটির লিজ প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসা-বানিজ্য সম্প্রসারন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এ সেতুটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপরে আমরা সড়ক ও জনপথের কর্মকতাদের সাথে কথা বলেছি। আশাকরছি সেতুটি টোলমুক্ত হবে।