শ্লীলতাহানী ও হত্যার মধ্যবর্তী সময়ে দায়িত্বহীন ছিলো পুলিশ ও জেলা প্রশাসন

image

ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার আগে শ্লীলতাহানীর ঘটনার তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ দায়িত্বে অবহেলা করেছে। নুসরাতকে হত্যার আগে তাকে শ্লীলতাহানীর ঘটনায় মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসন। নুসরাত যখন শ্লীলতাহানীর শিকার হন তখন তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া এবং অশ্লীল প্রশ্ন করে অপরাধ করেছেন পুলিশ। পাশাপাশি নুসরাতের নিরপত্তায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা পুলিশ ঘটনা ঠিকভাবে তদন্ত করলে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা প্রতিহত করা যেতো। নুসরাতকে শ্লীলতাহানী ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্য পেয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ১৬ এপ্রিল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন তুলে ধরেন কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। প্রতিবেদনে নুসরাত হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলা এবং তদন্তে গাফলতির সঙ্গে জড়িত থানা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ ৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় নেপথ্যের কারণ এবং ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করতে কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীর এবং উপপরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) এম রবিউল ইসলামের সমন্বয়ে একটি কমিঠি গঠন করে। তদন্ত কমিটি ১০ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসায় গিয়ে মাদ্রাসার ছাদ, নুসরাতের পরীক্ষা হল, অধ্যক্ষের দফতর, শ্রেণীকক্ষ, নুসরাতের বাড়ি, কবরস্থান পরিদর্শন করে। পাশাপাশি নুসরাতের পরিবারের সদস্য, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শিক্ষক, কর্মচারী, ছাত্রী, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ গত ৬ এপ্রিল ঘটনার দিন মাদ্রাসায় কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি তদন্তের সময় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, তার মা শিরিন আক্তার, নুসরাতের দুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও নাসরিন সুলতানা ফুর্তি, মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা ও পিয়ন নুরুল আমিন (গ্রেফতার), মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন, প্রভাষক খুজিস্তা খানম, পুলিশ সদস্য মো. রাসেল হোসেনের লিখিত জবানবন্দি গ্রহণ করে। মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সুপারিশমালা প্রকাশ করে।

মঙ্গলাবার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ তিনি একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে কীভাবে নিয়োগ পান, তা অবিশ্বাস্য। কারা তাকে নিয়োগ দিলেন, এর তদন্ত হওয়া উচিত। যদি অপরাধীদের যথাযথ বিচার হয় তবেই নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে।’ এ ঘটনায় ইতিমধ্যে পুলিশকে (ওসিকে) ক্লোজ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পুলিশের দোষী সদস্যদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবদেনে বলা হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদ যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মতো নৃশংসতা প্রতিহত করা যেতো। এ ঘটনায় পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবহেলা ও অপরাধ করেছেন। জেলা প্রশাসনেরও অবহেলা ছিল। কমিশন এসব কর্মকর্তার অপরাধ ও অবহেলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা নিজ অফিসকক্ষে নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানী করেন। তার নির্দেশেই তার ঘনিষ্ঠ সহচররা নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এর ফলে তার মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর থানা পুলিশ নুসরাতকে বিভিন্ন অশালীন প্রশ্ন করে। তারা বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করে। পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাতের ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এতে সোনাগাজী থানার ওসি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিপন্থী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সিরাজ উদ-দৌলা ১৯৯৫ সালে দৌলতপুর মাদ্রাসার সুপার ছিলেন। তখন ওই মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে তার সমকামিতার অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক প্রতারণার মামলা চলমান আছে। প্রতারণার মামলায় তিনি এর আগে জেলও খেটেছেন। তিনি ২০০১ সাল থেকে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি নিয়মিত তার অফিসে মেয়েদের ডাকতেন। তার কক্ষে একই সময় এক জনের বেশি ছাত্রীর প্রবেশ নিষেধ ছিল।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ছাত্রী ও অভিভাবকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি ও থানায় অভিযোগ করে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কখনও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তির প্রথম বর্ষ থেকেই নুসরাতের ওপর দৃষ্টি পড়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার। সিরাজ উদ-দৌলা তাকে বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দিতেন এবং সুযোগ পেলেই গায়ে হাত দিতেন। গত ২৭ মার্চ বেলা ১১টার দিকে সিরাজ উদ-দৌলা তার পিয়ন নুরুল আমিনকে নুসরাত জাহান রাফির ক্লাসে পাঠায় তাকে নিজ অফিস কক্ষে নিয়ে আসার জন্য। নুসরাত ভীত হয়ে তার দুই বান্ধবী নিশাত ও ফুর্তিকে নিয়ে অফিস কক্ষের দিকে যায়। নিশাত ও ফুর্তি অফিস কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নুসরাত অফিস কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে। অধ্যক্ষ সিরাজের কক্ষে সব সময় মেয়েরা একজন ছাড়া দ্বিতীয় জনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ কোন মেয়েকে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করতে হলে তাকে একা প্রবেশ করতে হতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ মার্চ সিরাজ উদ-দৌলা তার সিট থেকে উঠে এসে নুসরাতের পাশে দাঁড়ায় এবং পরীক্ষার প্রশ্ন অগ্রিম দিয়ে দেয়ার ও পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে তার কক্ষে আসার প্রস্তাব দেয়। নুসরাত রাজি না হওয়ায় টান দিয়ে তার মুখের স্কার্প খুলে ফেলে এবং পিছন থেকে জাপটে ধরে বুকের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেয়। এক পর্যায়ে নুসরাত হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে। সিরাজ উদ-দৌলা কলিংবেল টিপে পিয়ন নুরুল আমিনকে ডাকেন এবং বলেন, নুসরাত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নুরুল আমিন নুসরাতকে হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু অবস্থায় বসে থাকতে দেখে। নুসরাত তখন দৌড়ে অফিস কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে। সিরাজ উদ-দৌলা কক্ষ থেকে বের হয়ে নুসরতার তার বান্ধবী নিশাত ও ফুর্তিকে সব ঘটনা বলে এবং বাড়িতে চলে যায়। নুসরাতের মা তখন ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়েছিলেন। তিনি মোবাইলে তার ছেলের কাছ থেকে জানতে পারেন নুসরাতকে সিরাজ উদ-দৌলা তার কক্ষে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যেহেতু আগে থেকে অনেক কিছু জানতেন তাই বাড়ি না এসে লোকজন নিয়ে সরাসরি সিরাজ উদ-দৌলার অফিস কক্ষে যান এবং সেখানে থাকা বেতের লাঠি দিয়ে সিরাজ উদ-দৌলা কয়েকটি আঘাত করেন। সন্ধ্যায় তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় থানায় মামলা করেন। সিরাজ উদ-দৌলা গ্রেফতার হন এবং নুসরাত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়। সিরাজ উদ-দৌলার অপকর্মের দীর্ঘদিনের সঙ্গী নুরুদ্দিন, মাকসুদ, সিরাজ ও অন্যরা মিলে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি করার দাবিতে বিশেষ কমিটি গঠন করে। মিছিল ও পথসভা করে এবং মামলা উঠানোর জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। ১ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরু হয়। প্রথম দুটি পরীক্ষায় নুসরাতের ভাই নোমান নুসরাতকে পরীক্ষা কেন্দ্রে দিয়ে আসে এবং পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করে। কিন্তু তৃতীয় পরীক্ষার দিন অজ্ঞাত কারণে নুসরাতের ভাই নোমানকে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরীক্ষার হলে নুসরাতের সামনের সিটে বসা ছাত্রী নুসরাতকে বলে কে বা কারা তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করছে। নুসরাত ছাদে ছুটে যায় এবং সেখানে সিরাজ উদ-দৌলার ঘনিষ্ঠ সহচরদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। তারা নুসরাতের হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনে নুসরাতের হাতের বাঁধন খুলে গেলে সে গায়ে আগুন নিয়ে চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। উপস্থিত কর্মচারী ও পুলিশ সদস্য রাসেল তার গায়ের আগুন নিভিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে নুসরাত জাহান রাফি ১০ এপ্রিল রাত ৯টায় মারা যায়।

৭ দফা সুপারিশ

তদন্ত প্রতিবেদনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সাতটি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো- দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, দ্রুত দুই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা। বিরতিহীনভাবে সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব অবহেলার আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মাদ্রাসায় যারা সিরাজ উদ-দৌলাকে তার অপকর্মের সহযোগিতা করতেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাদ্রাসা গভর্নিং বডি পুনর্গঠন করা। নুসরাতের পরিবারের সব সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।