সম্রাট জুয়া ও চাঁদাবাজি থেকে যা পেতেন করতেন পাচার

image

ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার বাজি এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে যে অর্থ পেতেন সেই টাকার পুরোটাই দেশের বাইরে পাচার করেছেন যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। সিঙ্গপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই এবং আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ১ হাজার কোটি টাকার মূল্যের সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। অবৈধ অর্থে দেশে মাত্র ২ কোটি টাকার সম্পদ গড়লেও তা অধিকাংশ বেনামে গড়েছেন। অপরদিকে সম্রাটের অন্যতম সহযোগী যুবলীধ দক্ষিনের সহসভাপতি এনামুল হক আরমানও সম্রাটের মতো দেশের বাইরে শ’ শ’ কোটি টাকা পাচার করেছেন। দেশে সে নামে মাত্র সম্পদ গড়েছেন। তবে দেশের তাদের যে সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক সেই সম্পদেরও বৈধ কোন উৎস পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি দমন কশিনের অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) ক্যাসিনো ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট এবং তার সহযোগী এনামুল হক আরমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গির বাদী হয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে এবং উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন বাদী হয়ে আরমানের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করেন। মঙ্গলবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দু’জনের বিরুদ্ধে মোট ৫ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে মামলায় দুই কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার ৮৭ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। অপরদিকে যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের বহিষ্কৃত সহসভাপতি ও সম্রাটের অন্যতম সহযোগী এনামুল হক আরমানের বিরুদ্ধে মামলায় দুই কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আরমানের বিরুদ্ধে দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন।

দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানে দেশে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নামে কোন স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তার নামে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩ হাজার টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে যা তার আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট মজিঝিল ও ফকিরাপুল এলাকায় ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসব ক্লাবে নিজের লোক বসিয়ে ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনা করাতেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, এবং অবৈধ মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ইসমাইল চৌধুরী অবৈধ অর্থে বেনামে একাধিক প্লট, বাড়ি, ফ্লাটসহ স্থাবর অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই ও আমেরিকায় নামে বেনামে ১ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে তথ্য রয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, এনামুল হক আরমানের নামে ২ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেলেও সেই সম্পদ বৈধভাবে অর্জনের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এনামুল হক আরমান ক্যাসিনো পরিচালনা, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি থেকে যে টাকা পেতে সেই টাকার একটি অংশ সিনেমা ব্যবসায় ব্যয় করতেন। ওইসব সিনেমা তৈরির পর তা বিভিন্ন পেক্ষাপটে বিক্রি করে সেই অর্থ পুরোটাই দেশের বাইরে পাচার করেছেন। ঢাকায় যতগুলো ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো সামগ্রী এসেছে সেগুলো এনামুল হক আরমানই আমদানী করেছেন। এনামুল হকের টাকায় অবৈধ ক্যাসিনো সামগ্রী আমদানির পর তা বিভিন্ন ক্লাবের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। দেশ মাল্টিমিডিয়ার নামে ২টি সিনেমায় ২ কোটি টাকা খরচ করেছেন এনামুল। ওই টাকারও বৈধ কোন উৎস ছিল না। এনামুল হক আরমান সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার অবৈধ অর্থ পাচার করেছেন এবং সেখানেই অবৈধ অর্থে যে সম্পদ অর্জন করেছেন তা কয়েকশ’ কোটি টাকার হবে।

দুদক সূত্র জানায়, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট অবৈধভাবে যে অর্থ পেতেন তার সিংহভাগ দিয়েই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই এবং আমেরিকায় সম্পদ গড়েছেন। সেখানেই তিনি অধিকাংশ টাকা পাচারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছেন। দেশে তার নামে কোন সম্পদ নেই। কয়েকটি জায়গায় যে সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো বেনামে গড়েছেন। অর্থাৎ দেশের টাকায় বিদেশে অবৈধভাবে সম্পদ গড়েছেন সম্রাট। দেশে সম্রাটের কোন বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। এনামুল হক আরমান ছিল তার অন্যতম সহযোগী। সম্রাটের সঙ্গে সঙ্গে এনামুল দেশে খুব কম সম্পদ গড়েছেন। অবৈধ অর্থৈ সিমেনা তৈরির মাধ্যমে সম্পদকে বৈধ করার চেষ্ঠা ছিল আরমানের। আরমানও শত কোটি টাকা মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর পাচার করেছেন এবং ওই দুই দেশেই সম্পদ গড়েছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং আওয়াম লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করার পর ক্যাসিনো ক্যাণ্ডে সম্রাটোর নাম আসে। এর পর থেকে আত্মগোপনে চলে যাওয়া যুবলীগের দক্ষিণের সহভাপতি ও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে তার অন্যতম সহযোগী যুবলীগ দক্ষিণের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে ৭ আগস্ট কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযানে মামলা দায়ের হয়। গত ১৫ অক্টোবর ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। একই দিন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এনামুল হক আরমানকে মাদক আইনের মামলায় ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় সম্রাটের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সম্রাটের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান ছিল দুদকের।