সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার

image

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব পিআরএল- এ (অবসরোত্তর ছুটি) গেছেন। কিন্তু তিনি সরকারি প্রকল্পের টাকায় কেনা পাজেরো স্পোর্ট ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি এখনও ফেরত দেননি। অথচ ওই কর্মকর্তা সুদমুক্ত সুবিধা নিয়ে গাড়ি কিনেছেন, পিআরএল থাকাকালীন এক বছর গাড়ির খরচ বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকাও ভোগ করছেন। গাড়ি স্বল্পতার কারণে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে অবস্থিত ওই মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিবকে নিয়মিত লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়িতে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়া সরকারের ‘সিনিয়র সচিব’ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা গাড়ি ফেরত দেননি। তিনিও সুদমুক্ত সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন, গাড়ির মেনটেইন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণ) বাবদ প্রতিমাসে যাবতীয় খরচও নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি ‘এসইডিপি’ নামক একটি প্রকল্পের এক কর্মকর্তাকে এই বলে হুমকি দেন যে, ‘আমি আপনাদের প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করি। অথচ আমাকে একটি গাড়ি দেননি। অন্যদের দিয়ে রেখেছেন। আমার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা না করলে আমি আপনাদের সহযোগিতা করব না।’ জানা গেছে, এই কর্মকর্তাও সরকার থেকে সুদমুক্ত সুবিধায় ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। প্রতিমাসে গাড়ির ব্যয়বাবদ ৫০ হাজার টাকাও নিচ্ছেন।

শিক্ষা সংক্রান্ত একটি সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী নিজে একটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি নিজের ছেলে ও ছেলের বউকে পাজেরো ব্র্যান্ডের আরেকটি সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন। এ নিয়ে ওই কর্মকর্তার অধীনস্তরা কোন মন্তব্য করলেই তাদের বদলির হুমকিসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রভাবশালী অনেক কর্মকর্তা নিজে একটি গাড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবেও নিজের কব্জায় একটি গাড়ি সংরক্ষণে রাখছেন। এসব কর্মকর্তা পরিবারের লোকজনকেও অবৈধভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সুদমুক্ত সুবিধায় ঋণ নিয়ে গাড়ি ক্রয় এবং ওই গাড়ির যাবতীয় খরচ সরকার থেকে নিয়ে যারা বিভিন্ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছে তা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে কিনা জানতে ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবাদকে বলেছেন, ‘এটা অবশ্যই দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনৈতিক। এটা হলো প্রতারণার মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচয় করা। সরকারি কর্মকর্তারা কোন অবস্থাতেই একই সুবিধার নামে তিন প্রকার সুবিধা নিতে পারে না। যারা এই সুবিধা প্রদানের সঙ্গে জড়িত তাদের উচিৎ হবে কঠোরভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা এবং দৃষ্টান্তমূলকভাবে বিদ্যমান বিধিমালা কার্যকর করা।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার নৈরাজ্যে রূপ নিচ্ছে। মূলতঃ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং এগুলোর অধীনন্থ অধিদফতর ও সংস্থার প্রভাবশালী কর্মকর্তারাই সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। আবার প্রাধিকারপ্রাপ্ত না হয়েও অনেক ‘জুনিয়র’ কর্মকর্তা বিখ্যাত ব্র্যান্ডের গাড়ি হাঁকাচ্ছেন। বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে কেনা গাড়ির সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা অবসরে গিয়েও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে গাড়ি বুঝিয়ে নিচ্ছেন না। গাড়ি ফেরত চাইলে কখনও কখনও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধমকও দিচ্ছেন। কেউ কেউ ঋণের টাকায় গাড়ি কিনে গ্যারেজে ফেলে রেখে সরকার থেকে প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা খরচ নিচ্ছেন, নিজে প্রকল্পের গাড়ি হাঁকাচ্ছেন। আবার কেউ এই ঋণের টাকা একাধিক পুরোনো গাড়ি কিনে ‘রেন্ট এ কার’ বা ‘এ্যাপস’ভিত্তিক ভাড়ায় ব্যবসা করছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘২৬ ক্যাডার বিসিএস সমন্বয় কমিটি’র আহ্বায়ক ও গণপূর্ত প্রকৌশল অধিদফতরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূঁইয়া সংবাদকে বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে ২৬ ক্যাডারে আকাশ-পাতাল বৈষম্য বিরাজমান। এর ফলে স্বাভাবিক কারণেই অন্যান্য ক্যাডারে অসন্তোষ রয়েছে। আবার যারা গাড়ির প্রাধিকারপ্রাপ্ত, তারা গাড়ির অপব্যবহার করছেন। খুব সহসাই এই বৈষম্য নিরসনের কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ সরকারের সব স্তরেই এখন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা আছেন।’

সরকারের দু’জন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, ‘মূলত গাড়ি চালক স্বল্পতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঝামেলা এড়াতেই নগদায়ন ঋণের মাধ্যমে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের সুবিধা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহার হচ্ছে। আর এই অপব্যবহারের ক্ষেত্র হলো প্রকল্পের টাকায় কেনা গাড়ি। প্রকল্প অনুমোদনের আগে এর দলিলে (ডিপিপি) ইচ্ছেমত গাড়ির প্রয়োজনীয়তা দেখানো হয়। এরপর সেই অনুযায়ী গাড়ি আমদানি করে তা ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা হয়।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে নানা রকম নির্দেশনা ও সতর্কীকরণ নোটিশ জারি করলেও তা খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সরকারি গাড়ি ব্যবহারে কঠোর একটি নীতিমালা রয়েছে, তবে এটি কার্যকর করার দায়িত্বে যারা আছেন তারাই নীতিমালার শর্ত উপেক্ষা করে গাড়ি ব্যবহার করছেন, পাশাপাশি পছন্দের সহকর্মীদের নামি-দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি হাঁকানোর সুযোগ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ সালের আগে সরকারের যুগ্মসচিব ও এর ওপরের স্তরের (অতিরিক্ত সচিব ও সচিব বা সমপর্যায়ের) কর্মকর্তারা সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত ছিল। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়তে থাকায় এবং গাড়ির প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সবার জন্য গাড়ির যোগান দিতে হিমশিম অবস্থায় পড়ে ‘যানবাহন অধিদফতর’। এ কারণে ২০১২ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ির নগদায়ন ঋণ সুবিধা চালু করা হয়, অর্থাৎ প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনবেন, আর সরকার গাড়ির যাবতীয় ব্যয়বহন করবে।

প্রথম পর্যায়ে নিচের স্তরে গাড়ি প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয় ‘যুগ্মসচিব’। পরবর্তীতে গাড়ি নগদায়ন নীতিমালার আওতায় উপসচিবদের গাড়ির প্রাধিকাভুক্ত করা হয়। বর্তমানে যুগ্মসচিবের নিচের পদ ‘উপসচিব’রাও সরকারি গাড়ি পাচ্ছেন। গাড়ি নগদায়ন নীতিমালার আওতায় প্রায় ৪ হাজার কর্মকর্তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ (জনপ্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা) মাসে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। গাড়ি ক্রয়ের নগদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী, উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন গাড়ি কেনার জন্য।

গাড়ি সুবিধায় অন্য ক্যাডারে বৈষম্য

উপসচিবরা সরকারের পঞ্চম গ্রেডের (প্রশাসন ক্যাডারে চতুর্থ গ্রেড বিলুপ্ত) কর্মকর্তা, তারা সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা পান। সরকারের কোন কোন দফতরে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা গাড়ি সুবিধা পেলেও তা দেয়া হয় পরিদর্শন কাজের জন্য, তারা কর্মকর্তা হিসেবে গাড়ি পান না। বিশেষ করে পুলিশ, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, খাদ্য অধিদফতরের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা অস্থায়ীভিত্তিতে গাড়ি সুবিধা পান।

তবে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও গাড়ি সুবিধা না দেয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ অন্যান্য (২৫টি) ক্যাডারে অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারে চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্যও গাড়ি সুবিধা নেই। যদিও বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের (বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত) কর্মকর্তা, যারা যুগ্ম প্রধান এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব (ড্রাফটিং) তাদের এ সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ২৬ সেপ্টেম্বরের তথ্যানুযায়ী, উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত এই চার স্থরে বর্তমানে তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে উপসচিবদের একটি অংশ এখনও গাড়ির ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ পাননি। এর মধ্যে অন্য ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তাই বেশি। মোট কর্মকর্তাদের মধ্যে উপসচিব এক হাজার ৬৩৩ জন, যুগ্মসচিব ৭৫১ জন, অতিরিক্ত সচিব ৫৬৮ জন, গ্রেড-১’র (সচিব সমপর্যায়ের) ১২ জন এবং সচিব ও সিনিয়র সচিব ৭৬ জন।

জানা গেছে, গাড়ি নগদায়ন নীতিমালা সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট সংশোধন করা হয়েছে। এর আগেও কয়েক দফা এটি সংশোধন করা হয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণের টাকায় যেসব কর্মকর্তা গাড়ি কিনবেন তারা বিশেষ কোন কারণ ছাড়া সরকারি দফতর ও সংস্থার অন্য কোন গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক চিঠিতে গাড়ি প্রাধিকারপ্রাপ্ত নন- এমন কর্মকর্তাদের রুটের গাড়ি ব্যবহারে বার্ষিক ভাড়া পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। নানা কারণ দেখিয়ে এই ভাড়া পরিশোধ করতে চান না অনেকে।

গত ১৯ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০২০ সংশোধিত আকারে জারি করা হয়। এই নীতিমালার ১৭ (১)এ বলা হয়েছে, ‘সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণকারী কোন কর্মকর্তা সাধারণভাবে তার দফতর হতে রিকুইজিশনের ভিত্তিতে কোন গাড়ি সরকারি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন না।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোন কর্মকর্তা শিক্ষা ছুটিতে ওএসডি থাকলে তিনি সুদমুক্ত সুবিধায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা বাবদ পূর্বের মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা পাবেন।

নীতিমালার ১৪ (১) বলা হয়েছে, সুদমুক্ত সুবিধা নিয়ে কোন কর্মকর্তা গাড়ি কিনলে কর্মস্থলের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে কোন টিএডিএ বিল দাবি করতে পারবেন না। আর ১৪(৩)এ বলা আছে, এই গাড়ি ভাড়া, লিজ বা অন্য কোন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর বা বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহার করলে তা সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ বলে গণ্য হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নীতিসমূহ খোলাখুলিভাবে লংঘন করা হচ্ছে। অবস্থা লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানা যায়নি।