সামর্থ্যরে অর্ধেক পরীক্ষা : করোনা সংক্রমণের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি

image

মধ্য গোরানের বাসিন্দা একটি ব্যাংকের পিয়ন আসিফুর রহমান সলিল ৭ জুলাই সংবাদ’কে বলেন, গত ২১ জুন করোনা টেস্ট করিয়েছি, আজ ১৭ দিন হয়ে গেল, এখনও রিপোর্টের এসএমএস আসেনি। এভাবে চললে আমি চাকরিজীবী হয়ে কয় দিন আসা-যাওয়া করব। দেশে প্রতিদিন করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার যে সক্ষমতা আছে তার অর্ধেকও পরীক্ষা করা হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা সংবাদ’কে বলে, রাজধানীর ৩৭টিসহ ৭১টি ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন ২৭ থেকে ৩০ হাজার করোনাবাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু বাস্তবে ১৪-১৫ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে না। অন্যদিকে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট এক-দুই দিনের মধ্যে পাওয়ার কথা থাকলেও রিপোর্ট পেতে ১৫ দিন লেগে যায়। এমন অভিযোগ অনেকেই জানান। নমুনা বুথে ২০০ টাকা আর বাসায় গিয়ে নমুনা নিলে ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করেছে সরকার। সেটাও নেয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কয়েকটি সরকারি বুথ। কিন্তু নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকেই করোনা নমুনা পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিন পরীক্ষা করাতে আগ্রহীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মুগদা মেডিকেল কলেজ, মুগদা হাসপাতাল, পল্টন কমিউনিটি সেন্টার, শাহবাগ রেডিও ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি ও নগরীর বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ বুথে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ৫৪টি বুথে নমুনা সংগ্রহ হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ১০১টি বুথ স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু কিট সংকটের কারণে বাকি বুথগুলো তারা স্থাপন করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কোথায় নমুনা পরীক্ষা করাবেন তা না জানায় অনেকে পরীক্ষা না করে দিনের পর দিন বাসায় বসে থাকছেন। এতে করে সার্বিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রাজধানীতে ৩৭টি প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছে। এছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা শুধু নমুনা সংগ্রহ করে। সংগ্রহ করা নমুনা সরকার অনুমোদিত ল্যাবে পরীক্ষা করার পর ফলাফল জানিয়ে দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে।

সরেজমিনে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করাতে কোন টাকা দিতে হয় না। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। হাসপাতালের প্রতিনিধিরা যদি বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন তবে দিতে হয় ৪ হাজার টাকা। তবে বেসরকারি হাসপাতাল এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে আরও বেশি টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নমুনা দিতে হলে আগে অনলাইনে ফরম পূরণ করতে হয়, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া আছে। এই ফরম পূরণ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট নম্বর ০১৫৫২১৪৬২০২ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইলে একটি বার্তা যায়। পরবর্তীতে সেই বার্তা দেখালেই নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ওই ফরম পূরণ করা ছাড়া নমুনা পরীক্ষার সুযোগ নেই বিএসএমএমইউতে।

পূর্ব গোরানের ৯ রোডের বাসিন্দা মো. হাসান সংবাদকে বলেন, গত ২৯ জুন করোনা নমুনা টেস্ট করেছি। ৭ জুলাই পর্যন্ত মোবাইলে এসএমএসও আসেনি। টেস্টের রিপোর্ট কবে পাব এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কিছুই বলতে পারছে না।

খিলগাঁও বাসিন্দা মো. আয়নাল, মো. খোরশেদ, শাজাহানপুরের বাসিন্দা মো. সেলিম মোল্লা, শেখর চৌধুরীসহ বিভিন্ন করোনা রোগীর একই অভিযোগ।

এদিকে বিভিন্ন স্থাপিত করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের যেসব বুধ স্থাপন করা হয়েছে সেখানে করোনা পরীক্ষার জন্য আসা লোকের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। গোরানে দুটি বুথে করোনা রোগী বসার জন্য ৫০০ চেয়ার ছিল। পরীক্ষার জন্য আসা লোকজন ৫০০ চেয়ারই দখল করে বসে থাকতেন। কিন্তু গত কয়েক দির ধরে করোনা রোগী আসছেন খুব কম। এখন সেখানে নমুনা সংগ্রহের সময় অধিকাংশ চেয়ারই ফাঁকা পড়ে থাকে।

গোরান হাসপাতাল বুথের ম্যানেজার মো. গিয়াস সংবাদ’কে বলেন, আগে প্রতিদিন ১৫০ জন করোনা রোগীর নমুনা টেস্ট করা হতো। এখন ৫০ জনও আসে না। আমরা ৬ জন টেকনিশিয়ান বসে থাকি। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা টেস্টের রিপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে টেস্ট রিপোর্ট পাচ্ছেন না রোগীরা।

হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার খলিলুর রহমান বলেন, করোনা টেস্টের রিপোর্ট একদিনে পাবার কথা। সেখানে কেন ১৬-১৭ দিন লাগে এ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশিফ রশিদ সংবাদ’কে বলেন, এখানে দুই সেন্টারে ৫০০ জন করোনা রোগীকে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা আছে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত করোনা নমুনা টেস্ট করা হয়। রাত ৯টার মধ্যে সব করোনা রোগীর মোবাইলে রিপোর্টের এসএমএস যায়। প্রথম দিন নাহলে দ্বিতীয় দিন যাবেই। তাতেও যদি না যায়, সেটা অনিয়ম ছাড়া আর কি।

পল্টন কমিউনিটির বুথ সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে নমুনা রোগীর আসন প্রায়ই ফাঁকা থাকে। প্রতিদিন ৩০ রোগীর নমুনা পরীক্ষার কথা। সোমবার (৬ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১০ রোগীও আসেনি। এর কারণ হিসেবে জানান যায়, রিপোর্ট পাওয়ার অনিশ্চিয়তার জন্য সেখানে লোকজন পরীক্ষার জন্য যেতে আগ্রহ দেখান না।

শাহবাগ রেডিও ভবন বুথে ৩০-৩৪ জনের মতো রোগী দেখা গেছে। সেখানে ৫০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষার সুযোগ আছে। গত ৭ জুলাই দুপুর ১টা পর্যন্ত ৪০ জনের বেশি করোনা নমুনা টেস্ট হয়নি।

এ বুথের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম সংবাদ’কে বলেন, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই বুথ খোলা থাকে। প্রতিদিন রাত ৯টার মধ্যে রোগীর মোবাইলে এসএমএস যাচ্ছে। যদি না যায় তবে সেখানে অনিয়ম হচ্ছে বলতে হবে।

এছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও বুথে করোনা টেস্টের জন্য অসংখ্য রোগী ভিড় করলেও গত কয়েক দিন ধরে সবার নমুনা নেয়া হচ্ছে না। নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সঙ্গে জড়িতরা জানিয়েছেন, এখন নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর একেবারে প্রয়োজন ছাড়া, উপসর্গহীন ব্যক্তিদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না। আগে যেসব প্রতিষ্ঠানে ৩০০-এর মতো নমুনা সংগ্রহ করা হতো এখন সেখনে ১৫০ কিংবা ১৮০ জনের নমুনা নেয়া হচ্ছে।