কার নিয়ন্ত্রণে পুঁজিবাজার

image

কে বা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে পুঁজিবাজার? পাগলা ঘোড়ার মতো আচরণ করছে দেশে মূলধন জোগানোর এক খাতটি। একদিন অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে বাড়ছে তো পরদিনই আবার কমছে কোন কারণ ছাড়াই। টানা পতনে মাঝে মধ্যে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারে এমন আকস্মিক উত্থান-পতনকে কোন ফরমুলাতেই ফেলতে পারছে না ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন বাংলাদেশ (আইসিবি)। নির্দিষ্ট কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা। যদিও ব্রোকারেজ হাউসগুলো গুজবকে দায়ী করছেন, তবুও বিশ্লেষণে বলছেন- অনেক সময় গুজব ছাড়াও পুঁজিবাজার এমন অস্বাভাবিক আচরণ করে। অথচ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পুঁজিবাজারে স্থীতিশীলতা ফেরানোর আশ্বাস দিয়েছেন দায়িত্ব গ্রহণ করার কিছুদিন পরই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও দাবি করছে, তারা বাজার স্থিতিশীলতায় কাজ করছেন। প্রধান সমস্যা ‘তারল্য সংকট’ কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আইসিবিও বলছে, বিনিয়োগকারীদের জন্যই তারা বাজারে যথাসম্ভব বিনিয়োগ করছেন। সর্বশেষ ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য ধার নিয়েছে আইসিবি। এতকিছুর পরও বাজারে পতন থামছে না। দিন দিন তলানিতে নেমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, পুঁজিবাজার তাহলে কে বা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে? কোন একটি পক্ষ কী এমন আচরণের পেছনে কাজ করছে ? মাঝে মধ্যে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এর পেছনে কারণ কী? এসব বিষয় বিএসইসি দেখছে না কেন?

বাজারে স্থিতীশীলতা ফেরাতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিএসইসিতে সংস্কার। কারণ বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং প্রথম সংস্কারটা আনতে হবে বিএসইসিতে। এছাড়া ব্যাংকের তরল্য সংকট দূর করা, সুদের হার কমিয়ে আনা ইত্যাদি। তারা বলছেন, দেশের আর্থিক বাজারের দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠছে পুঁজিবাজারে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইর প্রধান সূচকটি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল গত ২৪ জানুয়ারি। ওইদিন সূচক ছিল ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে ও বাজার মূলধন প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ১৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ওই সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭৭২ পয়েন্টে আর বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ৯ মাসে সূচক কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ আর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৯ কোম্পানির মধ্যে ৪৬টি বা প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম এখন ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে বাজারে এসেছে। অনুমোদন দেয়া নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহজনক লেনদেনের।

সর্বশেষ গত সপ্তাহ থেকে টানা ৬ দিনে সূচক ২৩০ পয়েন্টের মতো কমে ৪ হাজার ৭১১ পয়েন্টে নেমে এসেছিল ডিএসইর সূচক। টানা দরপতনে দিশাহারা হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার হঠাৎ ডিএসইর সূচক ১১০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। কিন্তু পর দিন বুধবার আবার কমে সূচক কমে যায় ৪০ পয়েন্টে। আর বৃহস্পতিবারও কমেছে ১০ পয়েন্ট।

বাজারের এমন আচরণ জানতে চাইলে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেন সংবাদকে বলেন, বাজারের এমন আচরণ কোন ফরমুলাতেই ফেলতে পারছি না। তবে কোন একটা সমস্যা হচ্ছে- এটা বুঝতে পারছি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই এটি বের করতে হবে। বাজারকে ঠিক রাখতে আমরা প্রতিদিনই ক্রয়ের মধ্যেই আছি। গত এক বছরে আমাদের ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। আজও (বুধবার) আমাদের ট্রেড ছিল ৬৮ কোটি টাকা। আমরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্যই এসব করছি। আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি। বাজারের স্থীতিশীলতার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বাজার লেনদেনে আমাদের অংশগ্রহণ তো সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। বাকি আরও মার্চেন্ট ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর অংশগ্রহণটাই বেশি। আমরা ১০ শতাংশ অংশ নিয়ে যতটুকু পারা যায় করছি। আমরা মঙ্গলবারও বৈঠক করে এ কথাটিই বলেছি। বিএসইসি, ব্রোকারেজ হাউস, ডিএসই, সিএসই- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বাজার স্থীতিশীলতার মধ্যে আনা যাবে না।

এ বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিএসইর পরিচালক ও ব্রোকারেজ হাউস মালিকদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি শাকিল রিজভীর কাছে জানতে চাইলে বলেন, গতকাল (মঙ্গলবার) আইসিবির বিনিয়োগ নিয়ে এমনভাবে গুজব ছাড়ানো হয়েছিল যে, সূচক হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তবে যে কোন তুলনায় আজ (বুধবার) ঠিক আছে। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যেই এমন গুজব ছড়ানো হয় বাজারে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হঠাৎ বেড়ে যায় আবার এক-দু’দিন পরই আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারের এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাজার এমন অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের মধ্যে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, বিনিয়োগকরী প্রতিষ্ঠান আইসিবি, ডিএসই নানা পদক্ষেপ কথা বলছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। তাহলে বাজার আসলে কার নিয়ন্ত্রণে। বাজারের আচরণ দেখলে মনে হয়, কোন একটি পক্ষ যখন চায় বাজার বেড়ে যায় আবার যখন চায় না বাজার পড়ে যায়। যদি তা-ই হয়, তাহলে অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের যে ভূমিকা থাকার কথা, তা থাকবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। আসলে পুঁজিবাজারে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি মানুষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিএসইসিতে সংস্কার আনতে হবে। এছাড়া অর্থের অভাব, সুদের হার বেশি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে হবে।

২০১০ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, যে বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের কোনো আস্থা নেই, ওই বাজারে কেউ বিনিয়োগে আস্থাশীল হবে না- এটাই স্বাভাবিক। অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, যখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না, তখনই বাজারে বিপর্যয় ঘটে। এছাড়া বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যানের তৃতীয় দফায় নিয়োগটি হয়েছে আইনভঙ্গ করে। যখন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তি আইনভঙ্গ করে নিয়োগ পান, তখন তার পক্ষে বাজারে আইনের শাসন নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, বিএসইসিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি ডিএসইর সদস্যসংখ্যাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া দরকার। একটি বাজার মাত্র ২৫০-৩০০ ব্রোকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এতে কোটারি স্বার্থ কায়েম হয়। সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদকে পুরোপুরি ব্রোকারদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে।

বিএসইসির মুখপাত্র সাইফুর রহমানের দাবি- বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগই নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবপক্ষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

জানা গেছে, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এতে বাজারের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বাজারে ভালো কোম্পানি আনা ও ব্যাংকের বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে নগদ অর্থ জোগান দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। আইনি সীমার মধ্যে থেকে যেসব ব্যাংকের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, এগুলোর রেপোর বিপরীতে নগদ সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া এ সুবিধা নিতে এখন পর্যন্ত খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি ব্যাংকগুলো। একমাত্র বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক বিনিয়োগের জন্য রেপোর বিপরীতে ৫০ কোটি টাকা নিয়েছে। এর বাইরে গত মঙ্গলবার বিকেলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিয়ম সভায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর আশ্বাস দেয় আইসিবি।

আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল হোসেন ওইদিন জানিয়েছিলেন, সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে বন্ড বিক্রির ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এ টাকা আমরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি ৫টি ব্যাংকের কাছে ২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। ওই টাকা পেলেও আমরা তা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করব। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার গতিশীল করতে সরকার খুবই আন্তরিক। অর্থমন্ত্রীসহ সবাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সহযোগিত পাচ্ছি। তাই বাজার শীঘ্রই ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশা করছি। তাছাড়া এ মুহূর্তে শেয়ারবাজার খারাপ হওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। এরপরও বাজারে পতন চলছেই।

বিনিয়োগকারী কামাল আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করি। বাজার বিশ্লেষণ করে ক্রয়-বিক্রয় করে থাকি। কিন্তু এত সতর্ক থাকার পরও গত এক বছরে আমার ৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। কারণ বাজার স্বাভাবিক আচরণ করে না। স্বাভাবিক আচরণ করলে আমার ক্যালকুলেশন ঠিক থাকত। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে কিছু ঝুঁকি থাকবেই। তবে আমাদের বাজারে ঝুঁকির পরিমাণ খুব বেশি।