জনপ্রিয় হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

image

প্রত্যন্ত গ্রামে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। ব্যাংকের শাখা খুলতে যে পরিমান খরচ হয় তার চেয়ে কম খরচে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা যায়। এতে ব্যাংকের খরচও কমছে আবার সেবাও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। গত বছরের প্রথম দশ মাসে এজেন্টের মাধ্যমে ২১১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে বিভিন্ন ব্যাংক এবং প্রতিনিয়ত গ্রাম ও শহরে সমানতালে বেড়ে চলেছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সংখ্যা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের প্রথম দশ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) মোট ৬৫ হাজার ৬ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এজেন্টগুলোর মাধ্যমে একই সময়ে ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন গ্রাহক। আলোচ্য সময়ে এজেন্টের মাধ্যমে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১২৪ কোটি টাকা। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় রেমিট্যান্স এসেছে ৮৩৮ কোটি টাকা। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং করছে ১৯টি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের ৬ হাজার ৮০৮ এজেন্টের আওতায় ৯ হাজার ৭০৩টি আউটলেট রয়েছে। এজেন্ট ও আউটলেট বিস্তৃতিতে শীর্ষে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শাখার তুলনায় এজেন্ট পরিচালনার খরচ অনেক কম। তাছাড়া শহর বা গ্রামে এজেন্ট দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমনটি রয়েছে ব্যাংকের শাখা খোলার ক্ষেত্রে। কোন ব্যাংক চাইলেই শহরের কোন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নতুন করে শাখা খুলতে পারবে না। এ জন্য তাকে গ্রামাঞ্চলেও একটি নতুন শাখা খুলতে হবে। ফলে নতুন শাখার চেয়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঝোঁক বাড়ছে। এছাড়া স্বল্প লোকবলের মাধ্যমেই ব্যাংকের অধিকাংশ সেবা নিশ্চিত হওয়ায় দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে এজেন্ট ব্যাংকিং।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, যে ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকা- পরিচালনা করছে সেগুলো হলো- ডাচ বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, এবি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।

সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীসহ সমাজের সবার উপযোগী ও ব্যয়সাশ্রয়ী আর্থিক সেবা চালুর লক্ষ্যে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর মাত্র ৬ বছরেই এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখের কিছু বেশি। সাধারণত এলাকার পূর্বপরিচিত দোকানদার, ব্যবসায়ী বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রের এজেন্ট পয়েন্ট থেকে সেবা পাওয়ায় কোন ভীতি কাজ করছে না মানুষের মধ্যে। সমাজের একটি অংশ কেমন খরচ হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে- এসব কারণে ব্যাংকে যেতেন না। তারাই এখন এজেন্ট পয়েন্টে গিয়ে সঞ্চয় রাখছেন বা ক্ষুদ্রঋণ নিচ্ছেন।

জানা যায়, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। পাইলট কার্যক্রম শুরু করে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায়। জৈনসার ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ইসলাম শেখকে প্রথম এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এ সেবার মাধ্যমে ছোট অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করতে পারছেন। উপযোগ সেবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ প্রদান করতে পারছেন এজেন্টরা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন এসব এজেন্ট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজেন্ট ব্যাংকিং বিকাশের অন্যতম কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাশ্রয়ী সেবা প্রদান। এজেন্ট আউটলেটে একজন গ্রাহক সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। গ্রামীণ জনপদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এজেন্ট ব্যাংকিং তাই কার্যকরী একটি উদ্যোগ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোও তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রতিনিয়ত প্রসারিত করছে।