তিন মাস পর রেমিটেন্সে প্রণোদনার অর্থ পাচ্ছেন গ্রাহকরা

image

বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্সের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বুধবার সচিবালয়ে অর্থনৈতিক ও ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। এর অবৈধ পথে অর্থ পাঠানো নিয়ন্ত্রণে চলতি অর্থবছর থেকে রেমিট্যান্সে দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই ঘোষণা দেয়া হয়। অর্থাৎ কেউ যদি ১০০ টাকা রেমিট্যান্স পাঠান তাহলে গ্রাহক ১০২ টাকা পাবেন। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে পাঠানো অর্থের ওপর এ প্রণোদনা কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম রেমিটেন্সে এ ধরনের প্রণাদনা দেওয়া হচ্ছে। বাজেটে এ জন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এই ঘোষণার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রেমিটেন্স আয়ে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৪৫১ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩৮৭ কোটি ডলার। এ হিসাবে প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৬৪ কোটি ডলার বা ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। রেমিট্যান্সে এ প্রবৃদ্ধি স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অর্থবছরের তিন মাস পার হলেও প্রণোদনার অর্থ পাননি গ্রাহক। বুধবার (২ অক্টোবর) অর্থমন্ত্রী এই অর্থ বিতরণের ঘোষণা দেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, রেমিটেন্স বৈধ পথে আনার জন্য একটি প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছিলাম। ২ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন কেউ ব্যাংকে রেমিটেন্স পাঠালে ২ শতাংশ ইনসেনটিভ পাবে।

১ জুলাই থেকে যে পরিমাণ টাকা পাঠানো হয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রণোদনা পাওয়া যাবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন, তাদের অবহিত করতে চাই, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের পাওনা ইনসেনটিভ লস করবেন না। তাদের পাওনা তারা পেয়ে যাবেন। দু-একদিন লাগতে পারে পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করতে। সারা বিশ্বে আমরা সবাইকে এটি অবহিত করছি। ১ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে টাকার উৎস জানতে চাইবে না সরকার। কোনো কাগজপত্রও চাওয়া হবে না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এর বেশি হলে কাগজ দিতে হবে। প্রতি ট্রানজেকশ ১৫০০ ডলারের মধ্য থাকলে, দিনে যতবার ইচ্ছা করতে পারবে। প্রতি ট্রানজেকশনের জন্য ২ শতাংশ পাবে। এ ঘোষণার পর রেমিন্টেসে গতি বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত তিন মাসে রেমিন্টেস প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫-১৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে বাড়তি খরচ, হুন্ডি কারবারিদের প্রলোভনসহ নানা কারণে বুঝে না বুঝে প্রবাসীদের একটি অংশ অবৈধ পথে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এর প্রেক্ষিতেই এই প্রনোদনা ঘোষণা দেয়া হয়।

জানা যায়, বাজেটে প্রণোদনার ঘোষণার পর গত ৬ আগস্ট এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে অর্থবছরের তিন মাস, আর নীতিমালা জারিরও প্রায় দুই মাস হয়ে গেছে। কিন্তু কাঙ্খিত নীতিমালাটি এতোদিন কার্যকর হয়নি। যে কারণে দেশের বাইরে থাকা এক কোটি প্রবাসীকেও প্রণোদনা দেয়া শুরু হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী আয়ের বিপরীতে প্রণোদনা দিতে টাকা চেয়ে গত ৮ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর আবারও চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতেও অর্থ ছাড় করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই ব্যাংকগুলোতে প্রণোদনার টাকা যায়নি।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট এক হাজার ৬৪২ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। আগে কোন অর্থবছরে এত রেমিট্যান্স আসেনি। আর গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ১৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

২০১৮ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় অর্জনকারী ১০টি দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। ওই বছরে বিশ্বব্যাপী ৫২ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় পেয়েছে বিভিন্ন দেশ, যা আগের বছরের চেয়ে ৯.৬% বেশি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) সম্প্রতি এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। ওই অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন এক হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার। এর আগে ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমেছিল। টানা দুই অর্থবছর রেমিট্যান্স কমায় দুশ্চিন্তায় পড়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন হুন্ডি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে কেউ যেন টাকা পাঠাতে না পারে সে লক্ষ্যে দেশে ও দেশের বাইরে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সুফল মিলেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রায় ৫ মাস ধরে ডলার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অবশ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং আমদানিতে বাড়তি চাপের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আর বাড়ছে না। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন বড় প্রকল্পের পণ্য আমদানিতে বাড়তি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। রিজার্ভ ৩১.৮৫ বিলিয়ন ডলার : রেমিটেন্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। মঙ্গলবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুন-জুলাই মেয়াদের ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের নীচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ- এই নয়টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।