বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ : এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

image

সামাজিক নিরাপত্তায় এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পেছনে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছে। তবে বাংলাদেশে এর আওতা বাড়ছে ধীরে ধীরে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে এই সূচকে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১৩ লাখ বৃদ্ধি করা হতে পারে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আসবে ৮৭ লাখ মানুষ।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (এসকাপ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপের গত বছরের তথ্যানুযায়ী, দেশে কমপক্ষে একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাধীন রয়েছে মোট জনসংখ্যার ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় এ হার ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হারে মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে ভারত। শুধু সুবিধাভোগীর হার নয়, সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দের দিক থেকেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ খাতে সরকারের বরাদ্দ নেপাল ও ভুটানের তুলনায় কম।

এসকাপের প্রতিবেদনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১১টি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা জনসংখ্যার হার তুলে ধরা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পেছনে কেবল ভারত। পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। অবশ্য বিভিন্ন দেশ তার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কত শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় করে, তার চিত্রে পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও ভারতের কথা উল্লেখ আছে। এতে দেখা যায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্কের চেয়ে বাংলাদেশের ব্যয় কম। অন্যদিকে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের ব্যয় বেশি।

সামাজিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশ জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে। অন্যদিকে পাকিস্তান ব্যয় করে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে তুরস্ক। তাদের ব্যয়ের পরিমাণ জিডিপির সাড়ে ১৩ শতাংশ। দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা

কর্মসূচির আওতা বাড়ছে

অর্থমন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৭৩ দশমিক ২ কোটি টাকা। এটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর আওতায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সাড়ে ৭৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন ভাতা পাচ্ছেন। সুবিধাবঞ্চিত, হতদরিদ্র, বিধবা, অসচ্ছল মানুষ, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় সব ধরনের উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে আগামী বাজেটে। কিছু ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণও বাড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানে জাতীয় বাজেটের অধীনে একশ পঞ্চাশটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বৃহৎ কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, দুস্থ নারী, চা বাগানের শ্রমিক, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারী, হিজড়াসহ পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভাতা দিচ্ছে সরকার। আগামী বাজেটে বয়স্ক ভাতার উপকারভোগী ৪ লাখ, বিধবা ভাতার উপকারভোগী ৩ লাখ, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা সাড়ে ৫ লাখ, জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১০ হাজার চা-শ্রমিক ও অন্যান্য সুবিধা আরও ১৫ হাজারভোগী যুক্ত করা হবে। এজন্য বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, আসন্ন বাজেটে বয়স্ক ভাতা বাড়ানো হচ্ছে না। তবে ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৪ লাখ এবং বরাদ্দ ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে এ ভাতা দেয়া হয়। আগামী বাজেটে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতার আওতা বাড়িয়ে ১৫ লাখ ৪৫ হাজারে উন্নীত করা হচ্ছে। এছাড়া, বর্তমানে ৯০ হাজার অসচ্ছল প্রতিবন্ধী পরিবারের ছেলেমেয়ে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সর্বনিম্ন মাসিক ৭০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা করে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। আসছে বাজেটে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এই ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।

ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক ও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত গরিব রোগীদের এককালীন নগদ সহায়তা দেয় সরকার। বাজেটে গরিব রোগীদের জন্য নগদ সহায়তা বাড়ানো হবে। বর্তমানে ১৫ হাজার রোগী আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। আসন্ন বাজেটে এই সংখ্যা দ্বিগুণ করা হচ্ছে। এছাড়া বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং তাদের ছেলেমেয়েরা মাসিক ভাতাসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে। বর্তমানে ৬৪ হাজার জন এই সুবিধা ভোগ করছে। নতুন বাজেটে এই সংখ্যা ৮১ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সূত্র জানায়, গত চলতি বাজেটের আওতায় বর্তমানে ৭ লাখ দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয়া হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে এ সুবিধা দেয়া হবে ৭ লাখ ৭০ হাজার জনকে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৭৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।