বেসকারি ঋণে অর্জন হয়নি মুদ্রানীতির লক্ষ্য

image

বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ কমছেই। এমনকি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। গত জুন পর্যন্ত বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশের মতো। এটি গত বছরের মুদ্রানীতির ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৫ শতাংশ কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ না থাকায় ঋণ প্রবাহ করছে। তবে নানা অনিয়মে পড়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের কথাও বলছেন অনেকে। সবমিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। তাই আগামী মুদ্রানীতি আরও সংকোচনমূলক করা হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্য কিছুটা কমতে পারে বলে সূত্র বলছে। তবে সরকার একটি শিল্পবিপ্লবের দিকে যেতে চাইছে। এজন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর জন্য সুদের হার কমানোসহ নানা উদ্যোগের কথা বলছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাক্সিক্ষত জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাজারে মুদ্রা ও ঋণ সরবরাহ সম্পর্কে একটি আগাম ধারণা দিতে প্রতি ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ধারাবাহিকাতায় আগামী ৩১ জুলাই চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এটি ঘোষণা করবেন। মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তেমন নেই। চাহিদা না থাকায় নতুন মুদ্রানীতি আরও সংকোচনমুখী করা হয়েছে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পাশাপাশি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সংকুচিত অর্থব্যবস্থা, বিলম্বিত ব্রেক্সিট পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় অর্থবাজারে ক্রমবর্ধমান শ্রেণীকৃত ঋণের হার এবং কিছুটা সংকুচিত উদ্বৃত্ত তারল্য পরিস্থিতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতির ধারাকে ব্যাহত করতে পারে। এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন মুদ্রানীতির ভঙ্গিমা প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রকৃত অর্জন থেকে কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হবে। তবে চলতি মুদ্রানীতি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে তা অনেকটাই কমবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গুণগতমানের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বার্থেই বেসরকারি ঋণে গতি আনার বিকল্প নেই। এ জন্য বেসরকারি ঋণ কেন বাড়ছে না তার কারণ অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, এখানে দেখতে হবে বেসরকারি খাত ঋণ চেয়েছে কিন্তু ব্যাংক থেকে পেয়েছে কি, পায়নি। আমার জানামতে ঋণ চেয়ে পায়নি এমন উদাহরণ নেই। বরং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাই নেই। এর অর্থ যেকোন কারণেই হোক উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন না। বিনিয়োগটা মোটামুটি সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই বেসরকারি খাতে কেন উৎসাহী হয়ে বিনিয়োগ বাড়ছে না সেটা অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা কি বিনিময় হারের কারণে হয়েছে, না সুদ বেশি সে জন্য হচ্ছে, নাকি বেসরকারি খাতের লোকেরা ব্যাংকেরও মালিক, সে জন্য ব্যাংক থেকে বেশি প্রফিট পাচ্ছে এ কারণে হয়েছে। এসব বিষয় অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

জানা গেছে, খেলাপি ঋণের আধিক্য, তারল্য সংকট এবং ঋণ ও আমানতের অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের চাপে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে ধীরে চলো নীতিতে রয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অনেক ব্যাংকই শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বন্ধ করেছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদসহ আরও কিছু কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারাও ব্যাংকঋণের চাহিদা করছেন কম। এ জন্য গত জুন পর্যন্ত বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে।