ব্যাংক বন্ধ হলে কী হবে আমানতকারীদের?

image

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭৪ ধারা অনুসারে ব্যাংক বন্ধ হলে সবার আগে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগকৃত একজন লিক্যুইডিটর বা অবসায়ক এ কাজটি করবেন। এর মধ্যে প্রথমে পরিশোধ করতে হবে ছোট গ্রাহকদের অর্থ। তার পর বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের অর্থ। এর পর পর্যায়ক্রমে অন্যদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। ছোট গ্রাহকদের সুরক্ষায় সম্প্রতি গ্রাহক সুরক্ষা আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া বা বন্ধ হয়ে গেলে আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণের অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোন ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে আমানতকারীরা ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পাবে। এই অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। আমানত সুরক্ষা আইন-২০২০’র খসড়া নিয়ে সমালোচনার মুখেই এমন চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন আইনের খসড়াতেও আমানতকারীদের এক লাখ টাকা দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রাহকদের গচ্ছিত অর্থের বীমার পরিমাণও বাড়ানো হয়নি।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ব্যাংক আমানত বীমা আইন-২০০০ এর সংশোধনীসহ আমানত সুরক্ষা আইন নামে নতুন আইনটির খসড়া অনুমোদন করে মতামত চেয়ে ১৫ কার্যদিবস সময় দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে দিয়েছিল সরকার।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলছেন, এতে মূলত ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য উপকার হবে। ক্ষুদ্র আমানতকারীরা এ থেকে লাভবান হবেন। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেলেও তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য ইন্সুরেন্স তহবিল থেকে তাদের সহায়তার জন্য আইনটি করা হচ্ছে।

তাহলে এক লাখ টাকার বেশি থাকলে সে অর্থের কী হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, আমানতকারীদের টাকা কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং এ জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও আইন আছে। এখানে যে এক লাখ টাকার কথা বলা হয়েছে সেটি ইন্সুরেন্স থেকে দেয়া হবে। তবে এক লাখ টাকার বেশি যাদের টাকা জমা থাকবে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সেটি দেউলিয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ করবে। তিনিই ব্যাংকের সম্পদ বা অন্য কোনভাবে আমানতকারীদের গচ্ছিত টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। তিনি আরও বলেন, নতুন আইনটি হলে যাদের এক লাখ টাকার কম আমানত থাকবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তারা সেই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত হলে আর কোন ঝুঁকিতে থাকবেন না। এ প্রিমিয়ামও ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে নেয়া অর্থ থেকে দেবে না। বরং তারা নিজেরাই এ অর্থ প্রদান করবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিয়ে প্রিমিয়ামের হার কম-বেশি করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশে এখন ব্যাংক আমানত বীমা আইন হিসেবে যেটি আছে সেখানে শুধু ‘ব্যাংক’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এ নতুন আইনে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন আইনটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়ে পাস হলে এর আওতায় আমানত সুরক্ষা ট্রাস্ট তহবিল গঠন করা হবে।

একই সঙ্গে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানত সুরক্ষার বিপরীতে বীমা প্রিমিয়াম দিতে পর পর দু’বার ব্যর্থ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নে বা বন্ধ করার ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। যদি কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত বা দেউলিয়া হয়ে পড়ে তাহলে ওই তহবিল থেকে আমানতকারীর পাওনা পরিশোধ করা যাবে। আইনটিতে বলা হয়েছে, কোন বীমাকৃত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের আদেশ দেয়া হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ওই অবসায়িত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আমানতকারীকে তার বীমাকৃত আমানতের সমপরিমাণ টাকা, যা সর্বাধিক এক লাখ টাকা বা সরকারের পুর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত টাকার বেশি হবে না, তহবিল হতে প্রদান করবে।

জানা যায়, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭৪ ধারার অধিন বিভিন্ন উপধারায় বলা আছে, আদালত কোন ব্যাংকের অবসায়নের আদেশ দিলে তিন মাসের মধ্যে সরকারি অবসায়ক আমানতকারী ও আমানতের তালিকা বীমা ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে দাখিল করবে। সে মোতাবেক সবার আগে টাকা ফেরত পাবেন ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতকারীরা। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবশিষ্ট সম্পদ থেকে সব আমানতকারীর পাওনা পরিশোধ করা হবে। এরপর ফেরত দেয়া হবে বন্ড ইস্যুকারী বন্ডহোল্ডার ও প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের টাকা। এরপরও যদি টাকা থাকে তবে সেখান থেকে কোম্পানির উদোক্তা পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার টাকা ফেরত পাবেন।

প্রস্তাবিত আইনে অবসায়ন বলতে কোন কোম্পানি কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা, বন্ধ করা এবং দায়-দেনা নিষ্পত্তি করাকে বোঝায়। আইনটির খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পর তার আমানতকারীদের যে অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রাস্ট তহবিল পরিশোধ করবে সেটি সংশ্লিষ্ট দেউলিয়া হওয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদের বিপরীতে যে তারল্য থাকবে তার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। খসড়া আইনে আরও বলা হয়, আইনটি প্রবর্তনের পর প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রাস্ট তহবিলের সঙ্গে বীমাকৃত হবে। এছাড়া প্রত্যেক বীমাকৃত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের আমানতের অংশের ওপর প্রতিবছর এ তহবিলে প্রিমিয়াম প্রদান করবে।

তবে সংশোধিত খসড়া আইন অনুযায়ী, ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে আমানতকারী সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে দুই লাখ টাকা পাবেন। তিনি দুই লাখেরও বেশি টাকা ব্যাংকে জমা রাখলেও দুই লাখ টাকাই পাবেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং কোম্পানি আইন ১৯৯১ অনুযায়ী, বীমা করা অর্থের বাইরে যে আমানত রয়েছে, তা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাংকের সম্পদ বিক্রি করে পরিশোধ করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দু’একদিনের মধ্যে খসড়া আইনের সংশোধিত কপি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

তবে, অর্থের পরিমাণ এক লাখ থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ করার এ উদ্যোগও ব্যাংকিং খাতের ওপর আমানতকারীদের আস্থা বাড়াতে পারবে না বলে মনে করছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমানতের জন্য বিমার আওতা বাড়ানো কোন সমাধান নয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ব্যাংকিং সেক্টরে নজরদারি বাড়ানো। বীমার পরিমাণ বাড়িয়ে বেশিরভাগ আমানতকারীকেই তারা সুরক্ষা দিতে পারবে না।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণের ওপর দশমিক ০৮ থেকে দশমিক ১০ শতাংশ হারে বিমার প্রিমিয়াম দিতে হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত ডিপোজিট ইন্সুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ডে (ডিআইটিএফ) টাকার পরিমাণ ৭ হাজার ৪৩০ কোটিতে পৌঁছেছে, যা এর আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ০৩ শতাংশ বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১০ কোটি ২৮ লাখ অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ ১১ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জমা রাখা আমানতকারীদের অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৯০ শতাংশই আমানত সুরক্ষা বিমার অধীনে আছেন। কিন্তু, সরকার যদি এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা পরিশোধের নিয়ম করে, তাহলে বীমা করা অ্যাকাউন্টের পরিমাণ ৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৫-৯৬ শতাংশে দাঁড়াবে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জমা রাখা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয়। এর বেশিরভাগ সক্রিয়ও না। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে এলোমেলো পরিস্থিতি, তাতে যারা বড় অঙ্কের টাকা জমা রেখেছেন তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর সালেহ উদ্দিন আহেমদ বলেন, গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর প্রদত্ত প্রিমিয়াম বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের। প্রিমিয়াম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত প্রতিবেশী দেশ ও উন্নত দেশগুলোর প্রিমিয়াম রেট বিবেচনায় নেয়া।