শেয়ারবাজারে বড় দরপতনে দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা

image

শেয়ারবাজারে মূল্য সূচকের ধারাবাহিক পতনের সঙ্গে তারল্য সংকটও দেখা দিয়েছে চরমভাবে। রোববার (১৩ অক্টোবর) বড় দরপতনের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। আবারও ডিসইর প্রধান সূচক ৫ হাজারের নিচে নেমেছে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় রোববারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সবকটি মূল্য সূচকের বড় পতন হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।

এদিকে তারল্য সংকট কাটাতে গত ২২ সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলোকে আরও বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্টফোলিওতে সরাসরি বিনিয়োগ অথবা সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এই বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী ও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিএসইসির চেয়ারম্যানের দেয়া আশ্বাসেও পতন থামছে না শেয়ারবাজারে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববার ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৪৮ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৭৬১ পয়েন্টে নেমেছে। এর মাধ্যমে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বরের পর সূচকটি সর্বনি¤œ অবস্থানে নেমে এসেছে। ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর সূচকটি ছিল চার হাজার ৭৫০ পয়েন্টে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি চালু হওয়া ডিএসইএক্স শুরুতে ছিল চার হাজার ৫৫ পয়েন্টে। এরপর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সূচকটি ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রথম পাঁচ হাজার পয়েন্ট স্পর্শ করে। এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর সূচকটি ছয় হাজার ৩৩৬ পয়েন্টে ওঠে। এরপর কয়েক দফা উত্থান-পতন হলেও সূচকটি চলতি বছরের আগে আর পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নামেনি। তবে চলতি বছরের জুলাইতে সূচকটি পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। এর কিছুটা উত্থান-পতন হলেও বাজারে পতনের প্রবণতায় থাকে বেশি। ফলে বাজারের গতি ফেরাতে তৎপর হয়ে ওঠে সরকার। কিন্তু পতনের মধ্যেই রয়েছে শেয়ারবাজার। এর ধারাবাহিকতায় ডিএসইএক্স তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।

রোববার প্রধান সূচকের পাশাপাশি রোববার পতন হয়েছে অপর দুই সূচকের। এর মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ ১১ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৯৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৩৭৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এর মাধ্যমে টানা পাঁচ কার্যদিবস সবকটি সূচকের পতন হলো। মূল্য সূচক ধসে পড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। লেনদেনে অংশ নেয়া মাত্র ৪১ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরিতে কমেছে ২৬৭টির। আর ৩৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের ১৬ জুলাইয়ের পর ডিএসইতে আবারও তিনশ কোটি টাকার কম লেনদেন হয়েছে। রোববার দিনভর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৯৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর আগে গত ১৬ জুলাই ডিএসইতে ২৭১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়। এরপর গত তিন মাসের মধ্যে ডিএসইতে আর তিনশ কোটি টাকার নিচে লেনদেন হয়নি। তবে রোববার লেনদেন খরার বাজারে গত কয়েক কার্যদিবসের মতো টাকার অঙ্কে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে ন্যাশনাল টিউবসের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ওয়াটা কেমিক্যালের ১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। ১২ কোটি ২০ লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস। এছাড়া লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- মুন্নু জুট স্টাফলার্স, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যাল, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল, বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক এবং সামিট পাওয়ার।

একাধিক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বর্তমান বাজারে বড় সমস্যা অর্থ ও আস্থার সংকট। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে বড় সমস্যা মনে করছেন তারা। শেয়ারবাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলছেন বিএসইসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। তাই বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য লোক নিয়োগ দিলেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দূর হবে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারবাজারের এমন দুরবস্থায় দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা। প্রতিনিয়ত তারা পুঁজি হারাচ্ছেন। দিন যত যাচ্ছে পুঁজি হারানোর শঙ্কা আরও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির আতঙ্ক। অনেক ব্রোকারেজ হাউজে বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি শুরু করার অভিযোগও করছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

এদিকে সরকারের হস্তক্ষেপে সম্প্রতি শেয়ারবাজারের জন্য বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে রেপোর (পুনঃক্রয় চুক্তি) মাধ্যমে অর্থ সরবরাহের সুযোগ দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে ব্যাংকের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর)। এদিকে শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন বাংলাদেশ (আইসিবি)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ৫টি ব্যাংকের কাছে এ টাকা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবুল হোসেন সংবাদকে বলেন, সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এবং বিডিবিএল থেকে মোট এক হাজার কোটি টাকার জন্য আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও এক হাজার কোটি টাকার জন্য আবেদন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো এ ফান্ড পেলে তা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। এদিকে রোববার অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক সিএএসপিআই ১৪৫ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৫১০ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৩৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টির দাম বেড়েছে। কমেছে ১৮১টির। আর ২৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।