জাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা আহত ৩৫

image

জাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার একটি দৃশ্য-সংবাদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় আট শিক্ষকসহ ৩৫ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার () বেলা পৌনে ১২টা থেকে সোয়া বারোটা পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। হামলার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিকেল ৪টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলার জন্য ছাত্রলীগের প্রতি কৃতজ্ঞ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। হামলার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে সোমবার সন্ধ্যা থেকে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করেছে রেখেছিলেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর। মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১১টায় উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক-কর্মকর্তারা উপাচার্যকে বাসা থেকে বের করে তার কার্যালয়ে নিয়ে যেতে আসেন। এ সময় উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাকবিত-া হয়। এরমধ্যেই পৌনে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের এলোপাতাড়ি মারধর করতে শুরু করে। ছাত্রলীগ কর্মীরা শিক্ষার্থীদের লাথি-কিল-ঘুষি দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। মারধোরের সময় উপাচার্য সমর্থক শিক্ষক সোহেল আহমেদ, নাসির উদ্দিন, আতিকুর রহমান, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান জনিসহ কয়েকজনকে ‘ধর ধর’, ‘জবাই কর’ ও ‘মার মার’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে। আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে মুক্ত করায় ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ দেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, আমার সহকর্মীসহ ছাত্রলীগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে। এখন সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সবাই আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন।

এদিকে হামলা চলাকালে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশকে নিরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ছাত্রলীগের হামলায় আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গুরুতর আহত হওয়ায় আটজনকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানান জাবি চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. রেজওয়ানুর রহমান। আহত শিক্ষকরা হলেন- নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন, প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদসহ আরও কয়েকজন। মারধরে আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে- ৪৪তম ব্যাচের দর্শন বিভাগের মারুফ মোজাম্মেল, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মাহাথির মুহাম্মদ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাইমুম ইসলাম, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের রাকিবুল রনি, ৪৮তম ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের আলিফ মাহমুদ, অর্থনীতি বিভাগের উল্লাস, ৪৫ তম ব্যাচের দর্শন বিভাগের রুদ্রনীল, প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সৌমিক বাগচীসহ আরও অনেক আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এছাড়া ৪৪তম ব্যাচের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ছাত্রী মরিয়ম ছন্দা ও ৪৭ তম ব্যাচের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাউদা নামের দুই নারী শিক্ষার্থীকেও মারধর করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন- প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, মাইদুল ইসলাম, বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আজাদ, বার্তাবাজারের প্রতিনিধি ইমরান হোসাইন হিমু, বাংলা লাইভ টোয়েন্টিফোরের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান উজ্জল।

ছাত্রলীগের মারধরের বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষক পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এরকম ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। উপাচার্যপন্থি শিক্ষকদের উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ উসকানিতে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। ছাত্রলীগ যখন আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে তখন ভিসিপন্থি শিক্ষকরা তাদের স্বাগত জানিয়ে হাততালি দিয়েছে। আর হামলার বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, আমরা শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস চাই। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।

তবে আন্দোলনে শিবির সম্পৃক্ততার ছাত্রলীগের অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলকারীদের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, আন্দোলনে কোন শিবির সংশ্লিষ্টতা নেই। যেকোন শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য শিবির ব্লেইম দেয়াটা পুরোনো অপকৌশল। বুয়েটের আবরারকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে, এখানেও একইভাবে অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়েছে। উপাচার্য অপসারণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এমন অনেকেই আজ ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে যারা ক্যাম্পাসে বামপন্থি রাজনীতির চিহ্নিত মুখ। তাই তাদের এসব কথা তাদের দুর্নীতি ঢাকার অপকৌশল।

হামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ঘটনাস্থলে মব তৈরি হয়েছিল। চেষ্টা করেও আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বড় ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর আছি।

মারধরের ঘটনার আধাঘণ্টা পরে উপাচার্য তার সমর্থক শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে তার কার্যালয়ে যান। পরে সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, আমার সহকর্মী ও ছাত্রলীগ কর্মীদের এ গণ অভ্যুত্থানের জন্য ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন খুলে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক গতিতে চলবে। এদিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য হল ভ্যাকেন্ট ঘোষণা করে বিকেল ৫টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য তার কার্যালয়ে যাওয়ার পর দুপুর সাড়ে ১২টায় এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ। এছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও হল খালি করার নির্দেশের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রশাসন নির্দেশ দিলেও হল না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকসহ প্রায় ৩০০ জন মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার উপাচার্যের বাসা অবরোধ করতে গেলে সেখানে অবস্থানরত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধায় পড়ে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাস ভবন সংলগ্ন সড়কে বসে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান থেকে সরবেন না বলে জানান। একই স্থানে আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে আন্দেলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল বন্ধ করেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা পরিবহন চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। এছাড়া ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আবারও হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।