ডাকসু ভিপির ওপর হামলাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে উত্তাল ঢাবি

image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুরসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে উত্তাল ছিল পুরো ক্যাম্পাস। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন। একই দাবিতে তারা মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেল তিনটায় সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রসমাবেশ করারও ঘোষণা দিয়েছেন।

সরেজমিন জানা যায়, দুপুর ১২টায় টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রক্টরের কার্যালয়ের সামনে এসে অবস্থান নেয়। এ সময় প্রক্টর অফিসের কলাপসিপল গেট বন্ধ করে দেন প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা। এ সময় তারা প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি জানায়। সেখানে ১০ মিনিট অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা পুনরায় বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। রাজু ভাস্কর্যে এসে এক সমাবেশের মাধ্যমে তারা কর্মসূচি শেষ করে।

সমাবেশে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, বুয়েটে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের নাম মুছে দিয়েছে। আমরাও গণআন্দোলনের মাধ্যমে শীঘ্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের নাম চিরতরে মুছে দিব। তিনি বলেন, যে প্রক্টর সন্ত্রাসীদের হাত থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে পারেন না, তার পদে থাকার কোন বৈধতা নেই। আমরা প্রক্টরকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছি। অবিলম্বে তাকে পদত্যাগ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের নীরব ভূমিকার জন্য আমার ভাইয়েরা হামলার শিকার হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সমাবেশে ডাকসুর এ সমাজসেবা সম্পাদক কয়েকটি দাবিও তুলে ধরেন। এগুলো হলো- হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে, দ্রুত হামলার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করতে হবে এবং প্রহসনের জন্য প্রক্টরকে পদত্যাগ করতে হবে। এ সময় তিনি আজ বিকেল ৩টায় সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রসমাবেশের ঘোষণা দেন। সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্টসহ কয়েকটি বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা একাত্মতা পোষণ করেন।

প্রশাসনের পদত্যাগ চাইলেন জোনায়েদ সাকি : নুরুল হক নুরসহ অন্য ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আহত নুরকে দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের একথা বলেন তিনি। এর আগে রাজু ভাস্কর্যে শিক্ষার্থীদের সমাবেশে তিনি সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থাকতে কি করে এই নৃশংস হামলা হয়, সেই প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের পদত্যাগ চেয়ে তিনি বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনের কক্ষে এ রকম নৃশংস হামলা হয় কীভাবে? এটি আমাদের বোধগম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আছে নাকি নেই? আমাদের তো মনে হচ্ছে নেই। প্রশাসন নিজেই হামলার মদদদাতা। জোনায়েদ সাকি বলেন, ঢাবি প্রশাসনের যদি কোন প্রশাসনিক চরিত্র থাকত, তা হলে এভাবে ছাত্রদের ওপর কোন একটি পক্ষ লাইট অফ করে হামলা করত না। ঢাবি প্রক্টরের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত একজন ভিপি কী বক্তব্য দেবেন- এটি প্রক্টর নির্ধারণ করবেন না। একজন ভিপি শিক্ষাঙ্গন, সারাদেশ এমনকি সারাবিশ্ব নিয়ে কথা বলতে পারবে। এটি তার স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। প্রক্টর ভিপির বক্তব্যের ওপর যে মন্তব্যগুলো করেছেন, তাতে মনে হচ্ছে এই হামলায় তার সমর্থন আছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাদের বর্তমান ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে, তারাও এই হামলাগুলোর সঙ্গে জড়িত। তারাই এসব করাচ্ছেন কিনা, এটি আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদত্যাগ চাই।

হামলায় ছাত্রলীগ জড়িত না থাকার দাবি : ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সহযোগীদের ওপর হামলায় ছাত্রলীগ জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন। এতে কারণ ছাড়াই ছাত্রলীগকে জড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে নুরের দুর্নীতির যে অডিও ফাঁস হয়েছে, সেটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নুর, বহিরাগত এবং মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ মিলে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এর সঙ্গে ছাত্রলীগ কোনভাবেই জড়িত নয়। তবে হামলার ঘটনাকে অনাকাক্সিক্ষত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সনজিতকে ইসকনের সদস্য বললেন নুর : ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসকে ইসকন সদস্য ও ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এজেন্ট বলে দাবি করেছেন ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। গতকাল সকালে নিজের ফেসবুক পেইজে নুর এ দাবি করেন। সেখানে তিনি লিখেন, স্বৈরাচারের বিরোধিতা ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, হত্যাসহ নানা ধরনের বর্বরতার প্রতিবাদ করার কারণেই এ পর্যন্ত নয়বার আমাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ ডাকসুতে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি, ভারতীয় ‘র’ এর এজেন্ট, ইসকন সদস্য সনজিত ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম এবং তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামক ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও মামুনের নেতৃত্বে ৩ দফায় আমার ওপর হমলা চালানো হয়। সংগঠনের সহযোদ্ধাদের ওপর অসংখ্যবার হামলা চালানো হয়।’

হামলার ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কমিটি : রোববার ডাকসু ভবন ও মধুর ক্যান্টিন এলাকায় ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ তার অনুসারীদের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক এবং সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাঈনুল করিমকে সদস্য-সচিব করে ৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- শামসুন নাহার হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সুপ্রিয়া সাহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. অসীম সরকার, স্যার পিজে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সদস্য ড. মো. মিজানুর রহমান। ঘটনাটি তদন্ত করে ছয় কার্যদিবসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রদানের জন্য কমিটিকে অনুরোধ করা হয়েছে।

ডাকসু ভবনের সব সিসিটিভির ফুটেজ ‘হাওয়া’ : ডাকসু ভিপি নুরুল হকের ওপর হামলার পর এবার ডাকসু ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে গেছে। কে বা কারা ফুটেজগুলো গায়েব করল, সে ব্যাপারে কোন ধারণা নেই কর্তৃপক্ষের। ডাকসু ভবনের বাইরে ও ভেতরে মিলিয়ে মোট ৯টি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। ক্যামেরার ফুটেজগুলো ধারণ করা হতো ডাকসুর সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার আবুল কালাম আজাদের কক্ষে। সেই কক্ষে একটি মনিটর এবং একটি সিপিইউ ছিল। কিন্তু ডাকসু ভবনে নুরুল হকের ওপর হামলার ঘটনার পর সেই মনিটর এবং সিপিইউয়ের কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেন, গতকাল দুপুরে যখন ডাকসু ভবনে ভিপির ওপর হামলা হয়, তখন তিনি বিষয়টি জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানীর কার্যালয়ে যান। সেখানে প্রক্টর অফিসের একজন কর্মকর্তা তাকে জানান, ডাকসুর প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরে ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইন এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজীত চন্দ্র দাসকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে গিয়ে তারা ডাকসু ভবনের গেট খুলতে বলেন। কিছুক্ষণ পর গেট খুলে দিলে কিছু অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে তারা ভবনের ভেতরে ঢোকেন। আবুল কালাম আজাদ আরও জানান, দুই পক্ষ যখন দোতলায় মুখোমুখি অবস্থান করছিল, তখন তিনি আবার প্রক্টরের কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি জানান। প্রক্টর জানান, বিষয়টি তিনি দেখছেন। এরপর প্রক্টরের কার্যালয় থেকে বের হয়ে পরিস্থিতি জানানোর জন্য তিনি ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের কার্যালয়ে যান। তাকে কার্যালয়ে না পেয়ে মুঠোফোনে চেষ্টা করেন। কিন্তু শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম ফোন ধরেননি। এরপর তিনি নিজের কক্ষে এসে দেখেন, তার কক্ষের তালা ভাঙা এবং ভেতরে মনিটর ও সিপিইউ নেই। কে বা কারা সেগুলো নিয়ে গেছে, তা তিনি জানেন না।