ঢাবিতে বাণিজ্যিক সান্ধ্য কোর্স নিয়ে এখনও কোন সমাধান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ

image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাণিজ্যিক সান্ধ্য কোর্স নিয়ে এখনও কোন সমাধান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে সান্ধ্য কোর্সের জন্য নীতিমালা তৈরি করতে আগামী পাঁচ সপ্তাহ স্থগিত থাকবে ভর্তি কার্যক্রম। সান্ধ্য কোর্স ও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। একাডেমিক কাউন্সিলের সভার ১ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সান্ধ্য কোর্স নিয়ে একক কোন সিদ্ধান্ত আসতে পারেনি কাউন্সিল।

২৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা শুরু হয়। কাউন্সিলের প্রথমে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় ঢাবির অংশ না নেয়ার বিষয়ে কোন প্রকার বাধা ছাড়াই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা নানা তর্ক-বিতর্ক, উত্তেজনা ও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলতে থাকে। পরবর্তীতে পাঁচ সপ্তাহ সান্ধ্য কোর্সের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সান্ধ্য কোর্স পরিচালনার সময়োপযোগী নীতিমালা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে আরও রয়েছেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীন, ১৩টি অনুষদের ডিন ও দুটি ইনস্টিটিউটের (আইবিএ এবং শিক্ষা ও গবেষণা) পরিচালক। কমিটিকে ৫ সপ্তাহের মধ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করার জন্য বলা হয়েছে। নীতিমালা তৈরি করার পর কোন কোর্স থাকবে আর কোন কোর্স থাকবে না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এই ৫ সপ্তাহের মধ্যে কোন পত্রিকার বিজ্ঞাপন, ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তবে যে কোর্সগুলো চলমান রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

তবে সভায় অংশ নেয়া কয়েকজন শিক্ষক বলেন, সান্ধ্য কোর্সের পক্ষে অবস্থান নেয়া শিক্ষকরা এখানে বেশি এসেছেন। বিরোধীদের কমসংখ্যক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। যার জন্য সান্ধ্য কোর্সের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে উপাচার্যকে চাপ দেয়া হয়েছে।

একাংশের ‘তোপের মুখে’ শিক্ষক সমিতির সভাপতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সান্ধ্য কোর্সের পক্ষে কথা না বলায় শিক্ষকদের একাংশের (যারা সান্ধ্য কোর্সের পক্ষে) তোপের মুখে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল। সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের পর গাড়িতে উঠতে গেলে ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন এই শিক্ষক নেতা।

সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হয়। সভায় সান্ধ্য কোর্স পর্যালোচনা ও যৌক্তিকতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে শিক্ষকরা তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এই সভায় একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত সান্ধ্য কোর্সের কার্যক্রম বন্ধ রাখার পক্ষে বক্তব্য দেন মাকসুদ কামাল।

সভা শেষে নিজের কার্যালয়সংলগ্ন লাউঞ্জে সান্ধ্য কোর্সের বিষয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত জানাতে সংবাদ সম্মেলন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। সেখানে মাকসুদ কামালও ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে রাত সোয়া ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে গাড়িতে উঠছিলেন এএসএম মাকসুদ কামাল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মাদ আবদুল মঈন মৌখিকভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে মাকসুদ কামাল গাড়ি থেকে নামেন। তখন আরও ১৫-২০ জন শিক্ষক মাকসুদ কামালকে ঘিরে ধরেন।

ওই শিক্ষকরা মাকসুদ কামালকে বলেন, ‘আপনি আমাদের নেতা। কিন্তু সভায় আমাদের পক্ষে আপনি কেন অবস্থান নেননি? আপনি এখনই আমাদের সঙ্গে গিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে সান্ধ্য কোর্স নিয়ে কথা বলবেন। মাকসুদ কামাল তাদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে যা করার, উপাচার্য তাই করবেন। উপাচার্য হলেন আপনাদের অভিভাবক। তখন সেখানে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশের নেতা আ ক ম জামাল উদ্দিন মাকসুদ কামালের উদ্দেশে বলেন, আপনারা নীল নকশা আঁকছেন। আপনার শিক্ষক সমিতি থেকে পদত্যাগ করা উচিত।

এ ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, আমি শিক্ষকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। সেই হিসেবে তারা যেকোন অভাব-অভিযোগ আমাকে জানাতেই পারেন। একাডেমিক কাউন্সিলের সভা শেষে আমি বেরোনোর পর কয়েকজন শিক্ষক আমার কাছে এসে সান্ধ্য কোর্সের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণ জানতে চান। তাদের বক্তব্য শোনার পর আমি চলে যাই।

শিক্ষকদের একাংশের হাতে লাঞ্ছিত সাংবাদিকও

সান্ধ্য কোর্সের পক্ষে কথা না বলায় অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল যখন শিক্ষকদের একাংশের তোপের মুখে পড়েন, তখন মোবাইলে এই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রুবেলের ফোন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপকসহ তিনজন শিক্ষক। পরে ঘটনাস্থলে থাকা দু’জন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক পরিস্থিতি শান্ত করেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা শিক্ষক ও সাংবাদিকরা। এদিকে ভুক্তভোগী সাংবাদিক জানিয়েছেন, এই বিষয়ে দ্রুতই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর অভিযোগ দায়ের করবেন।

নীতিমালা হলে সান্ধ্য কোর্সের সংখ্যা অর্ধেকও থাকবে না

বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা, জাতীয় চাহিদা ও শিক্ষার গুণগত মান বিবেচনায় নিয়ে সান্ধ্য কোর্স নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও সান্ধ্য কোর্স নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ। তিনি বলেছেন, বর্তমানে যেভাবে সান্ধ্য কোর্স পরিচালিত হচ্ছে, নীতিমালা করা হলে এভাবে চালানো যাবে না। তখন নীতিমালার শর্ত পূরণ করেই কোর্সের অনুমোদন নিতে হবে। নীতিমালা প্রণীত হলে সান্ধ্য কোর্সের সংখ্যা এর অর্ধেকও থাকবে না। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

সান্ধ্য কোর্স বিষয়ে অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ বলেন, আমরা সান্ধ্য কোর্সের বিপক্ষে না। আমরা এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে এসব সান্ধ্য কোর্স। এভাবে তো চলতে দেয়া যায় না। তাই এসব সান্ধ্য কোর্স নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

সান্ধ্যকালীন কোর্সের আয় বিষয়ে তিনি বলেন, একটি ফ্যাকাল্টি নাকি বছরে ৭০-৭৫ কোটি টাকা আয় করে সান্ধ্য কোর্স থেকে। এসব টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে আসে না কেন? বলা হচ্ছে, ফ্যাকাল্টির উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে। সেটি ঠিক আছে। তবে এসব অর্থ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে আসতে হবে। পরে বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের প্রয়োজনীয়তার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে খরচ করা হবে। শিক্ষকদের সান্ধ্য কোর্সে অতি আগ্রহ বিষয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান দেবেন, তা ঠিক নয়। তাকে গবেষণা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সময় দিতে হবে। এখন যদি একজন শিক্ষক শুধু ক্লাসই নেন। তাহলে সেটি গুণগত শিক্ষার প্রতিবন্ধক। তাই একজন শিক্ষক কয়টি কোর্স পড়াতে পারবেন, সেটিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

‘যৌক্তিকতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদন জমা দিতে প্রায় নয় মাস লেগেছে। এখন পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে নীতিমালা প্রণয়ন সম্ভব কী না?’ এমন প্রশ্নের জবাবে নাসরিন আহমাদ বলেন, আসলে যৌক্তকতা যাচাই কমিটির আহ্বায়ক বেশি সময় লাগার কারণ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন ও কয়েক দফায় তথ্য সংগ্রহের কারণে রিপোর্ট জমা দিতে দেরি হয়েছে। তবে তাদের কাজটি আমাদের নীতিমালা প্রণয়নের কাজকে এগিয়ে রাখবে। এ ছাড়া নীতিমালা প্রণয়নের টিমও অনেক বড়। আশা করছি, পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে নীতিমালা প্রণয়ন সম্ভব হবে।