ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় বারবার এসব ঘটনা ঘটছে : ঢাবি শিক্ষক সমিতি

image

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষক মজনুকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছে ঢাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ আটটি দাবি জানিয়েছেন ঢাবির নারী শিক্ষার্থীরা। ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে ঢাবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না কেন? যে ভিকটিম সে তো ট্রমায় (মানসিক আঘাত) মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায়। তাই ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশে ধর্ষণের ঘটনায় যথাযথ বিচার না হওয়ায় বারবার এসব ঘটনা ঘটছে। এর আগে কুমিল্লায় সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যাথযথ বিচার হয়নি। যেটি ঘটেছিল ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরে। আর গত রোববার (৫ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাটিও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। তাহলে আমাদের মেয়েরা নিরাপদ কোথায়? আমরা সব ধর্ষণের ঘটনার যথাযথ বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করে ঢাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন থেকে তারা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। পাশাপাশি বাংলাদেশে যে আইন রয়েছে তার ও সংস্কারের প্রয়োজন বলে মনে করি। সংস্কার করে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হোক যেন ভবিষ্যতে কেউ ধর্ষণ করার আগে নিজের জীবনের যে অপূর্ণ ক্ষতি হবে তা নিয়ে ভাবতে পারে। তারা বলেন, জনসম্মুখে ধর্ষককে ফাঁসি দেয়া হোক। এরকম শাস্তি নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশে আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে না।

এছাড়া, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দুপুর ২টায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে দুপুরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন সংস্কারের আহ্বান ঢাবি শিক্ষক সমিতির :

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে যে আইন বাংলাদেশে প্রচলিত আছে তার ও সংস্কার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এ দাবি জানানো হয়। বুধবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে ধর্ষকের শাস্তি দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা চাই এই নরপিশাচের যেন দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। আমাদের দাবি হবে, সরকারের আইনি কাঠামোতে যদি কোন ফাঁকফোকর থেকে থাকে, তাহলে তা যেন দূর করা হয়। এই ঘটনা যেন ধর্ষণের শেষ ঘটনা হয়।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ধর্ষক আর রাজাকারের কোন পার্থক্য নেই। যদি রাজাকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে ফাঁসি হয়, তাহলে ধর্ষকেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। এ সময় নারী ও শিশু নির্যাতনের যে আইন বাংলাদেশে প্রচলিত আছে, তার ও সংস্কার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, সুস্থ, সুন্দর, সামাজিক পরিবেশের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। মুজিববর্ষে আমাদের শপথ হোক দেশ হবে ধর্ষকমুক্ত। দেশকে ধর্ষকমুক্ত করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আহ্বান জানান তিনি।

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন- উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের চেয়ারপারসন ড. সানজিদা আক্তার, রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, সিন্ডিকেট সদস্য হুমায়ুন কবির, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শরীফ উল্লাহ ভুইয়া, গণিত বিভাগের অধ্যাপক চন্দ্রনাথ পোদ্দার, কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এএম আমজাদ, সহকারী প্রক্টর আবদুর রহিম প্রমুখ।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি :

বুধবার বিকাল পাঁচটার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত এক নারী সমাবেশে আটটি দাবি জানানো হয়। সমাবেশে বিশ^বিদ্যালয়ের পাঁচটি নারী হলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

দাবিগুলো হলো- ‘ধর্ষণের দ্রুত বিচারে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল’ গঠন; সব আদালতে নারী নিপীড়ন সেল গঠন করে এক বছরের মধ্যে ধর্ষণের মামলার বিচার; টিএসসি থেকে সুফিয়া কামাল হল, গণতন্ত্র তোরণ থেকে সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট পর্যন্ত ল্যাম্পপোস্ট ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন; বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নিজস্ব ইস্যু নিয়ে কনসাল্ট করার জন্য ৪-৫ জন নারী শিক্ষক দিয়ে ফিমেল উপদেষ্টা নিয়োগ; বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের আইনি সহয়তার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন; ক্যাম্পাস থেকে ভবঘুরে, নেশাখোর ও পাগল অপসারণ; ক্যাম্পাসের বাস স্টপেজগুলোর নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনা করা; ইমার্জেন্সিতে অনাবাসিক ছাত্রীদের হলে অবস্থান করার অনুমতি।’

সমাবেশে সংহতি জানিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, প্রতিনিয়ত আমরা ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে দেখতে পাই। কিন্তু আমরা তার সুষ্ঠু বিচার পাই না। ধর্ষণের মতো এ ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মনোভাব ও চলমান সংস্কৃতি সমানভাবে দায়ী। অবিলম্বে এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা বলেন, দেশে প্রতিদিন কোন না কোন জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে কিন্তু সেগুলো আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কখনও একটি ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। আমাদের সেই ছাত্রীর মতো সকব ভুক্তভোগী নারী যদি ধর্ষকের শাস্তি চাইতো তাহলে ধর্ষকরা মাথাচড়া দিয়ে উঠতে পারত না।

এছাড়াও সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজলী সেহরীন ইসলাম, প্রভাষক মার্জিয়া রহমান, শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি প্রমুখ।