প্রজেক্ট বাস্তবায়নে তিন গুন সময় পার হওয়ার পর প্রশ্ন: ঢাবি ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আসবে কবে!

image

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৬ সালে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনার কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে ঢাবি কর্তৃপক্ষের চুক্তি অনুযায়ী এক বছরের মধ্যে সিসিটিভি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করতে বলা হলেও এ পাইলট প্রজেক্ট বাস্তবায়নে পৌনে ৩ বছর লেগে গেছে। দুই সপ্তাহ আগে এ প্রজেক্টের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। প্রজেক্টের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয়েছে ১১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা। আবার এরই মধ্যে ২৪টি ক্যামেরা সংযোগবিহীন অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো সংস্কার করা হয়নি। এছাড়া ক্যাম্পাসে অনবরত চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছে। তাই পুরো ঢাবি ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় কবে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউজিসি পরিচালিত হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহেন্সমেন্ট প্রজেক্টের (হেকেপ) মাধ্যমে ঢাবি ক্যাম্পাসকে অপটিক্যাল ফাইবারের আওতায় আনার জন্য ইতোমধ্যেই আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ওই কেবল দিয়েই সিসিটিভি পরিচালনা করার সম্ভাব্যতাও যাচাই করেছে প্রশাসন। এরই মধ্যে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অপটিক্যাল ফাইবারের একক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্চুয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাবি ও চুয়েটে সিসিটিভি স্থাপনের পর এর অভিজ্ঞতা ও ফিডব্যাক কাজে লাগিয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সিসিটিভি স্থাপনের বিষয়টি ভাবছে ইউজিসি।

সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৬ সালের ২৬ আগস্ট নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনার কর্মসূচি হাতে নেয় উচ্চশিক্ষা মান উন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) কম্পোনেন্ট। ঢাবির সঙ্গে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (চুয়েট) এ প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়। এ ব্যাপারে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সে বছরের ১৫ জুন ইউজিসি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী পাইলট প্রজেক্টের আওতায় সিসিটিভি স্থাপনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৭৫ লাখ ও চুয়েটের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৭৫ লাখ টাকা। সিসিটিভি স্থাপনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব পড়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এ লক্ষ্যে টেন্ডার সম্পন্ন করে কর্মপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করার কথা বলা হয়। তবে ২০১৬ সালে এ চুক্তি হলেও পাইলট প্রজেক্টের আওতায় এ টেন্ডার গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাস হয়। আর ২০১৯ সালের এপ্রিলে এ পাইলট প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়।

পাইলট প্রজেক্টের ঢাবি ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দায়িত্বে ছিলেন ঢাবির তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. শরিফুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. কাজী মুহাইমিন-আস-সাকিব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংবাদকে বলেন, ২০১৬ সালে পাইলট প্রজেক্টের প্রপোজাল দেয়া হয় ইউজিসিতে। প্রপোজাল যাচাই-বাছাই শেষে ইউজিসি আমাদের ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দেয়। এরপর আমরা যখন ডিজাইন করি, তখন মনে হয়েছিল ২০ কোটি টাকার পূর্ণ প্রজেক্ট অনুমোদন হলে তা দিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। আমরা সে কথা ইউজিসি এবং বিশ^ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানাই। তারা আমাদের প্রথম দফায় পাইলট প্রজেক্ট দেয় এবং বলে, পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে পরে পূর্ণ আরেকটি প্রজেক্ট দেয়া হবে। সম্ভবত ২০২০ সালে ইউজিসির আন্ডারে সে প্রজেক্ট আসবে। ডিজাইন শেষে আমরা টেন্ডার করি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা এ কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দিই। এক সপ্তাহ আগে সে কাজ শেষ হয়েছে (তিনি এ তথ্য দেন ২৭ এপ্রিল)। কাজ সমাপ্তির পর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য এতে সই করেছেন।

মুহাইমিন-আস-সাকিব বলেন, পাইলট প্রজেক্টের আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১১৩টি সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রশাসনিক ভবন ও এর আশপাশেই বেশিরভাগ সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। তবে পাইলট প্রজেক্ট বিধায় পুরো ক্যাম্পাসকে সিসিটিভির আওতায় আনা যায়নি। পাইলট প্রজেক্ট যেহেতু সম্পূর্ণ প্রজেক্টের শতকরা ৫-১০ শতাংশ, সেহেতু সম্পূর্ণ প্রজেক্ট হাতে না পেলে পুরো ক্যাম্পাসকে সিসিটিভির আওতায় আনা যাবে না। এ জন্য সময় লাগবে, লাগবে অর্থও। কাজ সম্পূর্ণ করতে মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যেহেতু আমাদের সব বিষয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন, সেহেতু তার তত্ত্বাবধানে সার্বিকভাবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে সিসিটিভির আওতায় আনতে হলে একটা মাস্টারপ্ল্যান দরকার। কারণ পুরো কাজ একবারে করা সম্ভব নাও হতে পারে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ করলে দ্রুত পুরো কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব। আনঅফিশিয়ালি আইসিটি সেল সিসিটিভির রক্ষণাবেক্ষণ করে। কারণ আমাদের তো লোকবল নেই, তাদের আছে। তারা যাতে অফিশিয়ালি দেখেন, এ জন্য উপাচার্যকে একটি চিঠি দিতে হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা উপাচার্যকে চিঠি দিতে চাচ্ছি।

এদিকে ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের কারণে স্থাপিত ১১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে ২৪টি সংযোগবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুহাইমিন-আস-সাকিব বলেন, ক্যামেরা নষ্ট হয়নি। শুধু সংযোগ নষ্ট হয়েছে। তাই আইসিটি সেল চাইলে যে কোন সময় এসব ক্যামেরা আগের বা নতুন কোন স্থানে সংস্থাপন করতে পারবে।

গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় নেই সিসিটিভি ক্যামেরা : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩টি স্থানে ছিনতাইয়ের পরিমাণ বেশি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, স্যার এএফ রহমান হলের পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয় গেট ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’-এর মোড়, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল পার্শ্ববর্তী পলাশী মোড়, এসএম হল পার্শ্ববর্তী স্বাধীনতা সংগ্রাম চত্বর, ফুলার রোড, নীলক্ষেত-কাঁটাবন সড়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব, ভিসি চত্বর (স্মৃতি চিরন্তন চত্বর), জগন্নাথ হল পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, টিএসসি এলাকা, কলা ভবন, বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তা, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র ও বিজ্ঞান অনুষদ পার্শ্ববর্তী দোয়েল চত্বর এলাকায় অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে বেশি। ক্যাম্পাসে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত চিহ্নিত বিপদসংকুল এসব জায়গায় নেই সিসিটিভি ক্যামেরা। এফ রহমান হলের সামনের রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব এলাকা কাভার দিতে পারে না। দোয়েল চত্বরের একপাশে সিসিটিভি থাকলেও অন্য দিকগুলোয় নেই। এসব জায়গায় নিয়মিত চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটলেও নেই পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামরা। এ কারণে খুব সহজেই দুর্বৃত্তরা অপরাধ করে পালিয়ে যায়। তাদের আটক বা শনাক্তও করা সম্ভব হয় না।

সিসিটিভি আছে, ফুটেজ নেই : বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কখনও ‘লাইন কাটা। তাই ফুটেজ নেই’, কখনও ‘গাছ পড়ে সার্ভার নষ্ট হয়ে গেছে’- এসব মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাদের। এ বিষয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাহেব আলী সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি দোয়েল চত্বরে ছুরিকাঘাতে এক কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ চেক করতে গিয়ে কোন ফুটেজ পেলাম না। আবার শামসুন নাহার হলের সামনে থেকে বাইক চুরির এক ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে কোন সিসিটিভিই পেলাম না। শুধু এ ঘটনা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ফুটেজ পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি।

এদিকে মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাবি ক্যাম্পাসে পোস্টার লাগায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরীর। এসব বিষয় ভাবাচ্ছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে, ভাবাচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় এলে অপরাধীরা কোন অপরাধ করতে সাহস পাবে না।

সিসিটিভির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) সেলের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আসিফ হোসেন খান সংবাদকে বলেন, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত সিসিটিভির দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী সংবাদকে বলেন, সিসিটিভির রক্ষণাবেক্ষণ করছে আইসিটি সেল। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারাই ভালো বলতে পারবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সংবাদকে বলেন, সব বিষয় দেখে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করব।