বর্জন বিক্ষোভ চলছে প্রতিহত করার ঘোষণা ছাত্রলীগের

image

রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে টানা তিনদিন ধরে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। টানা আন্দোলনের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) সাত কলেজ সংকট সমাধানের দাবিতে ছাত্রলীগের কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীদের একাংশের এ আন্দোলনে কিছুটা ভাটা পড়ে। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করা ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনের ওপর হামলা ও ভিপি নুরুল হক নুরকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। আজ থেকে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ছাত্রলীগ নেতারা বলেছেন, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাঁধা দেয়া হলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হুমকি থাকলেও অধিভুক্তি বাতিলসহ হামলার প্রতিবাদে আজ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলনে উত্তাল ছিল পুরো ক্যাম্পাস।

প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে তারা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল শেষে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে (ভিসি চত্বর) অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে বেলা ১টার দিকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে দিনের আন্দোলন স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা। তবে ভবনগুলোর তালা তখনও ঝুলানো ছিল। একই সময় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রলীগের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তবে সমাবেশে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও তার অনুসারীদের দেখা যায়নি।

সমাবেশে গোলাম রাব্বানী বলেন, আমরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। তিনি আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন, ডাকসু ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ^াস দিয়েছেন। আলোচনার মাধ্যমে ক্লাস-পরীক্ষা সচল রেখে আমরা এর সমাধান করব। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে যদি সংকট সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয় তবে ছাত্রলীগ সমাধানের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তুলবে। এরপরও যারা ক্যাম্পাসে তালা লাগিয়ে পরীক্ষা বিঘিœত করতে চায়, শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার অধিকার ক্ষুণœ করতে চায় তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে বলে আমরা মনে করি।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, সাত কলেজ সংকট সরকারের কারণে হয়নি। আমরা বিশ^াস করি, দুই উপাচার্যের দ্বন্দ্বের বলি হয়েছি আমরা। সাত কলেজের সমস্যার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংকটে রয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন বিদ্যমান বাস্তবতায় অনেক কঠিন। সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে একটি অংশ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলতে চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার জিম্মি করে যদি কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কায়েম করতে চায়, কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের দাদাগিরি বন্ধ করে দেয়ার সক্ষমতা ছাত্রলীগের রয়েছে। কাল থেকে ক্লাস-পরীক্ষা চলবে। এতে কেউ বাধা দিলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তার দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে।

প্রত্যক্ষদর্র্শীরা জানান, সমাবেশ শেষে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিতে যান তারা। অপরাজেয় বাংলা থেকে মিছিল নিয়ে উপাচার্য কার্যালয়ের প্রধান ফটকে গিয়ে তালা ভাঙতে উদ্যত হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীরা তালা ভাঙতে বাধা দেয়। পরবর্তীতে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাক-বিত-া হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আখতারসহ শিক্ষার্থীদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে উপাচার্য দেশে না থাকায় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন ছাত্রলীগ নেতারা। এ সময় ভিপি নুরুল হক নূর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

স্মারকলিপির বিষয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছি। উপাচার্য দেশে ফিরলে আমরা সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। ভিপি নূরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে ছাত্রলীগের এই ঘোষণার পরও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আন্দোলনের মুখপাত্র শাকিল মিয়া বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলন চালিয়ে আসছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদকের ওপর হামলার অভিযোগ : স্মারকলিপি প্রদানের সময় দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মল চত্বরে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মারধর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও আখতারের মারধরের প্রতিবাদ জানাতে গেলে ভিপি নূরকেও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে লাঞ্ছিত করা হয়। হামলার বিষয়ে আখতার বলেন, ছাত্রলীগ সমাবেশ করে যখন প্রশাসনিক ভবনে যায়, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা অংশ ছিল। তাদের দেখার জন্য সেখানে যাই। তারা স্মারকলিপি দেয়ার জন্য ভেতরে যায়। তখন আমরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখান থেকে চলে আসার সময় জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক রাব্বি আমাকে মারধর করে। আমি অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

এদিকে হামলার প্রতিবাদে ডাকসু ভিপি নূরের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন বেশকিছু শিক্ষার্থী। মিছিল শেষে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন নূর। স্মারকলিপি প্রদান শেষে শোভন, রাব্বানী ও সাদ্দামের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে প্রবেশ করে সমাবেশ পণ্ড করে দেয়। এ সময় ভিপি নূরের উদ্দেশ্য করে অশালীন মন্তব্য করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।