মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন স্থগিত করে ক্লাসে ফিরছেনা বুয়েট শিক্ষার্থীরা

image

আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তারা আবরার হত্যার বিচারসহ অন্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেই বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চার্জশিট দাখিলের পর সেটার ভিত্তিতে অপরাধীদের অ্যাকাডেমিকভাবে স্থায়ী বহিষ্কার হবার আগ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণাও দিয়েছেন। এছাড়া, বুয়েট ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আজ এক গণশপথে অংশ নিবেন।

মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এসব তথ্য জানান। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বুয়েটের ১৫তম ব্যাচের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েম। তিনি বলেন, দশ দফা দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। দাবিগুলোর মধ্যে তিনটি দাবি ছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। ইতোমধ্যে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে, জবানবন্দী দিয়েছে অনেকে; অনেকের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। এ কারণে আমরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৎপর ছিলেন বলেই এত দ্রুত এই বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার ব্যবস্থা তার স্বাভাবিক গতিতে বিচার কাজ এগিয়ে নিবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

সায়েম বলেন, আমাদের দশটি দাবির মধ্যে পাঁচটি ছিল বুয়েট প্রশাসনের কাছে। দাবি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বুয়েট প্রশাসনের তৎপরতা লক্ষ্য করেছি। জড়িতদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। নোটিশ এসেছে জড়িতদের তদন্তের ভিত্তিতে স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তের ভিত্তিতে নতুন করে যদি কোন অপরাধীর নাম ওঠে আসে তাদেরকেও আজীবন বহিষ্কার করা হবে। আবরারের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করা হবে বলেও আমাদের নোটিশের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। বুয়েটে সাংগঠনিকভাবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি হলে হলে রাজনৈতিক কক্ষগুলো সিলগালা করা হয়েছে। সাধারণ ছাত্র ও প্রাধ্যক্ষের উদ্যোগে অবৈধ ছাত্রদের উৎখাত করা হয়েছে। বিআইআইএস একাউন্টে নির্যাতিতদের অভিযোগ জানাতে একটি প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ মনিটরিং করার জন্য প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি করার দাবি জানিয়ে এসেছি।

বুয়েটের ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এ শিক্ষার্থী বলেন, আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, আমাদের ভাইয়ের লাশকে কেন্দ্র করে আড়ালে অন্তরালে অনেক স্বার্থান্বেষী সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। এই বিষয়ে আমরা সুস্পষ্ট করে বলতে চাই, এসব মহলের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। পাশাপাশি আমরা দেশবাসীকে আহ্বান জানাই, এ সব স্বার্থানেষীদের এজেন্ডা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। রাজপথে আমাদের অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করে কোন অপশক্তিকে এই আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কোন সুযোগ দিতে চাই না।

আন্দোলনকারী এ শিক্ষার্থী আরও বলেন, চলমান তদন্ত প্রক্রিয়া ও দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধনের মাধ্যমে বুয়েট প্রশাসন যে সদিচ্ছা ইতোমধ্যে দেখিয়েছে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামীকাল (আজ) আমাদের মাঠ পর্যায়ের আন্দোলনে আপাতত ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামীকাল (আজ) বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মিলে এক গণশপথে অংশ নেব। এর মাধ্যমে আমরা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখে দেয়ার শপথ নেব। স্পষ্টভাবে বলতে চাই মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন আপাতত স্থগিত থাকলেও দাবি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চার্জশিট দাখিলের পর সেটার ভিত্তিতে অপরাধীদের অ্যাকাডেমিকভাবে স্থায়ী বহিষ্কার হবার আগ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবে না। আমরা খুনিদের সঙ্গে একই একাডেমিক সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠতে রাজি না।

এর আগে আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারসহ ১০ দফা দাবিতে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকালে ক্যাম্পাসে আসেন বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তবে, তারা রাস্তায় অবস্থান না করে নিজেরা বৈঠক করেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় সবার সম্মতির ভিত্তিতে তারা এই ঘোষণা দেন।

প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেন শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার ঘটনায় খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি, বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যান। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। বুয়েটের কোন শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাও দেন তিনি। আবরার হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ১৯ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।