অভাবের তাড়নায় মেয়েকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা

image

একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন মঞ্জুর হাসান, থাকতেন রাজধানীর মুগদা মানিকনগর এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। স্বল্প আয়ে স্ত্রী রোকসানা আক্তার রুমি ও তিন বছরের ফুটফুটে মেয়ে রোজা ফারদিনকে নিয়ে সুখেই ছিলেন তিনি। কিন্তু বিধি বাম। সুখ বেশি দিন কপালে সয়নি। মাসখানেক আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান মঞ্জুর হাসান। তার মৃত্যুর পরে পরিবারে নেমে আসে ঘোর অমাবস্যা। কোনমতে বেঁচে থাকতে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ধর্ণা দিতে থাকেন রোকসানা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না।

অবশেষে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কমলাপুরের আধা কাঠা জমিতে মেয়েকে নিয়ে থাকার জন্য ভাই স্বপনের কাছে দাবি তোলেন। কিন্তু জমিটা কোনমতেই দিতে রাজি হয়নি স্বপন। দুই দিন আগে ১৫ জুন শনিবারও স্বপনের কাছে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে শেষবারের মতো জমিটা চান। কিন্তু স্বপনের মনের বরফ গলেনি। অন্য কোন দিকেও ছিল না আশার আলো। তাই বাধ্য হয়ে অভাবের তাড়নায় মেয়ে রোজাকে আইসক্রিমের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করেন রোকসানা। এরপর নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ১৬ জুন রোববার রাতে মুগদার ওই বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার পর পুলিশকে দেয়া রোকসানার স্বীকারোক্তি ও পারিবারিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নিহত রোজার চাচা মো. সোহেল বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার উত্তরপাড়া এলাকায়। রোজার বাবা মঞ্জুর হাসান ১ মাস আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকে মেয়েকে নিয়ে মানিকনগর মিয়াজান গলির বাসাতেই থাকতেন। কিন্তু পরিবারের কোন আয় না থাকায় অভাব অনটনে দিন কাটছিল। এজন্য রোকসানা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কমলাপুরের আধা কাঠা জমিটি চাইছিলেন ভাইদের কাছে। কিন্তু তারা দিচ্ছিল না। সর্বশেষ শনিবারও রোকসানা কমলাপুরে এসে ভাই স্বপনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করে গেছেন বলে প্রতিবেশীরা জানান।

এরপরেই হয়তো সে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে বলে আমাদের ধারণা। সোহেল আরও জানান, কমলাপুরের ওই জায়গাতে রোজার বাবার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এজন্য ১৭ জুন সোমবার রোজার লাশ বাবার পাশে দাফন করার জন্য নিয়ে গেলে বাধা দেয় স্বপন। ওখানকার কমিটি এই লাশ দাফন করতে রাজি না বলে রোজার লাশ অন্যত্র নিয়ে যেতে বলে স্বপন। রোকসানা বলেন, ওই জমির দরকার নেই আমাদের। শুধু রোজাকে ওর বাবার কাছে দাফন করতে চাই বলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

মুগদা থানার ওসি প্রলয় কুমার সরকার বলেন, এ ঘটনায় শিশু রোজার চাচা সোহেল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্ত রোকসানাকে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার অবস্থা ভালোর দিকে। আজ তাকে আদালতে পাঠানো হতে পারে। ওসি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে রোকসানা জানিয়েছে, স্বামীর মৃত্যুর পর কেউ তাদের আশ্রয় দেয়নি। এমনকি কমলাপুরে পৈতৃক সম্পত্তির আধা কাঠা জমি ভাগাভাগির সমস্যা দেখিয়ে তা দিতে রাজি হয়নি তার ভাই। এজন্য আত্মহননের পথ বেছে নেয় সে। তবে এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কিনা-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানায়, রোববার দিবাগত রাতে কাপ আইসক্রিমের সঙ্গে ১০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রোজাকে খাইয়ে নিজেও খায় রোকসানা। এরপর রোজাকে কোলে করে ঘর থেকে বের হয়ে সন্দেহজনক আচরণ করতে থাকেন তিনি। এ সময় মা-মেয়ের মুখে ফেনা দেখে আশপাশের বাসিন্দাদের সন্দেহ হয়। পরে দ্রুত তাদের উদ্ধার করে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোজাকে মৃত ঘোষণা করেন। রোকসানা ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।