ধানমন্ডিতে জোড়া হত্যাকাণ্ডে মৃতদের শরীরে একাধিক জখম : সন্দেহের তীর নতুন গৃহকর্মীর দিকে

image

রাজধানীর ধানমন্ডিতে খুন হওয়া গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতির শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন পেয়েছে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। তিন সদস্যের বোর্ড গঠন করে ২ নভেম্বর শনিবার দুই মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। বোর্ডের প্রধান ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সোহেল মাহমুদ। সঙ্গে ছিলেন প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস ও কবির সোহেল। ময়নাতদন্ত শেষে কবির সোহেল জানান, নিহত দুইজনের শরীরে ছুরিকাঘাতের একাধিক জখম ছিল। আফরোজা বেগমের পেটে, বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এর মধ্যে একটি আঘাত তার কিডনি ভেদ করে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে তিনি বলেন, তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তবে গলা কাটার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। ঘটনার দুইদিনেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া ছাড়া নতুন কোনো অগ্রগতি নেই। তবে নিহতের পরিবার ও পুলিশের সন্দেহ, ঘটনার দিন কাজ নিতে আসা নতুন গৃহকর্মী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ঘটনার পর থেকে তার সন্ধানও পাওয়া যাচ্ছে না।

ধানমন্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ জানান, ওই গৃহকর্মীকে ধরতে অভিযান চলছে। পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তারিমের শ্বশুরের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) বাচ্চু ও বাড়ির ইলেকট্রিশিয়ান বেলায়েতকে আটক করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, বাচ্চুই নতুন গৃহকর্মীকে নিয়ে এসেছিল। সার্বিক আলামত বিবেচনায় নিয়ে জোড়া খুনের ঘটনায় নতুন গৃহকর্মীকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। সে একাই কাজটি করেছে নাকি তার সঙ্গে আরো কেউ জড়িত ছিল, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে গৃহকর্মীর ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। তাকে ধরার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।

ময়নাতদন্তের পর শনিবার দুপুরের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসেন আফরোজা বেগমের ভাগিনা এম এ করিম। তিনি জানান, স্থানীয় মসজিদে আফরোজার প্রথম জানাজা শেষে লাশ ঢাকায় রাখা হয়। নিহতের নাতি লন্ডন থেকে আসার পর মরদেহ গ্রামের বাড়ি গফুরগাঁও দাফন করা হবে। পরিবারের সবাই শোকে থাকায় শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা করেনি। তারা মামলা করবেন। তবে কে বা কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নয় তারা।

খবর পেয়ে শুক্রবারই ঢাকায় আসেন নিহত গৃহকর্মীর দুই ভাই। শনিবার দুপুরের পর ঢামেক হাসপাতাল মর্গে দিতির লাশ নিতে আসেন তারা। এ সময় দিতির ভাই মো. জসিম জানান, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের পাগলায়। গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের বাড়িও ওখানে। প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে দিতি আফরোজার বাসায় কাজ করে আসছিল। সর্বশেষ গত ঈদে দিতি বাড়ি যায়। এরপর আর যায়নি। আফরোজা বেগম বলছিলেন, দিতিকে বিয়ে দিবেন। জামাইকে তাদের নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও দিবেন। তারা এর আগে অনেক গৃহকর্মীকে এভাবে বিয়ে দিয়েছেন, জামাইকে চাকরিও দিয়েছেন। কিন্তু দিতি এর আগেই চলে গেছে! তবে ঘটনার সঙ্গে নতুন গৃহকর্মীকে সন্দেহ করা হলেও তার নাম-ঠিকানা কিছুই জানতে পারেনি পুলিশ। প্রাথমিকভাবে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এতে দেখা যায়, ওই গৃহকর্মী ওই দিন সন্ধ্যায় ওই বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। সিসিটিভির ফুটেজের ক্লু ধরে পুলিশ এগোচ্ছে। তবে প্রতিবেশী অনেকে বলছেন, শুধু গৃহকর্মীর একার পক্ষে এমন জোড়া খুন সংঘটিত করা সম্ভব নয়।

তবে এসব বিষয় মাথায় নিয়ে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে বলে জানান ধানমন্ডি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল কাফি। তিনি বলেন, বাচ্চু ও বেলায়েতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাচ্চু নতুন গৃহকর্মীকে আনলেও সে আগ থেকে তাকে চিনতো না। খুনের সঙ্গে বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের পর জানা যাবে। এদিকে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আতিক জানান, বাচ্চু, তিন সিকিউরিটি গার্ড, একজন ক্লিনার এবং একজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে আফরোজা বেগম ও তার গৃহকর্মী দিতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই বাসায় আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতি থাকতেন। এর উপরের তলায় অর্থাৎ পঞ্চম তলায় নিহত আফরোজার মেয়ে দিলরুবা থাকনে।