নিস্ব বস্তিবাসির চোখে শুধুই অন্ধকার

image

রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি কলোনি বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুঁড়ে গেছে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি। শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাত পৌনে চারটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কারো ঠাঁই হয়েছে বস্তির পাশে থাকা মাঠের খোলা আকাশের নিচে। কোথায় থাকবেন, কি খাবেন এসব চিন্তায় চোখে শুধুই অন্ধকার দেখছেন তারা। অগ্নিকান্ডের কারন ও ক্ষতির পরিমাণ জানতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বস্তিবাসী জানিয়েছে, রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। ঠিক তার আগে আগুন আগুন চিৎকার কানে আসে বস্তিবাসীর। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেকের ঘর পুঁড়ে ছাঁই হয়ে গেছে। বেশির ভাগ বস্তিবাসীই কোন কিছু নিতেও পারেননি। জুয়েল হক (৪২) নামে এক বস্তিবাসী বলেন, আগুন লাগার পরপরই দমকল বাহিনী গাড়ি নিয়ে আসে। কিন্তু সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। সামনে ও পেছনে ছিল খাল। পানি সরবরাহের অভাব ছিল না। তারপরও কেন এমন হলো?

তিনি জানান, তার ঘর থেকে ২০ ঘর দুরে ছিল আগুন। সেই দৃশ্য দেখে তিনি দ্রুত তার স্ত্রী ও সন্তানদের বস্তির পাশে থাকা মাঠে রেখে আসেন। বস্তিতে ফিরে এসে ঘরে দেখেন সব পুঁড়ে ছাই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর পর ঘরের কাছে যান কিন্তু ততক্ষণে পোড়া অংশ ছাড়া কিছুই নেই। এই বস্তিতে গত সাত বছর থেকে থাকতেন প্রাইভেটকার চালক কবির হোসেন। তার গ্রামের বাড়ী কুমিল্লায়। এই আগুন তার জীবিকার লাইসেন্সও গিলে খেয়েছে। টিভি-ফ্রিজ, খাট-আসবাবপত্র ছাই হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

শনিবার দুপুর পর্যন্ত এই দম্পতি বস্তির পাশের মাঠে সন্তানকে নিয়ে ছিলেন। এক মাসের বাচ্চাকে কি খাওয়াবেন সেই খাবারও তাদের ঘরে এখন নেই। এই দম্পতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফুটপাতে শরবত বিক্রিকারী সুজন, তার একমাত্র অবলম্বন ভ্যানগাড়ীটিও পুঁড়ে ছাই হয়ে গেছে। কবির দম্পতি ও সুজনের মতোই এক আগুন নিঃস্ব অনেকে অনেক পরিবারকে।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাসেল শিকদার জানিয়েছেন, ভোর রাত ৩ টা ২০ মিনিটে আগুনের খবর আসে। এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২ টি ইউনিট সেখানে ছুটে যায় এবং প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা করে। ভোর ৫ টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় অনেকগুলো ঘর পুঁড়ে গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও কারণ তিনি জানাতে পারেননি।

শনিবার দুপুরে সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্তরা এই পোড়া জিনিসপত্রের উপর দাঁড়িয়ে কি যেনো খুঁজছে। অনেকে নিজের ঘরের পোড়া অংশগুলো সংগ্রহ করছেন। কেউ খুঁজছেন যদি পোড়া অংশ থেকে কিছু পাওয়া যায়। বস্তিবাসীর অভিযোগ, আগুন লেগেছিল মূলত বস্তির গোডাউন থেকে। সেখান থেকে বাতাসের কারণে তা দ্রুত ছড়িয়েছে। তাদের দাবি, দুই বস্তি মিলে এই আগুনে পাঁচ শতাধিক ঘর পুড়েছে। এদিকে গৃহহারা বস্তিবাসীর ঠাঁই হয়েছে টিঅ্যান্ডটি কলোনির মাঠে খোলা আকাশের নিচে। তারা বলছেন, ফায়ারের কর্মীরা সঠিক সময়ে আসলেও সবকিছু সেট করতে বিলম্ব করায় সব পুড়ে গেছে।

সকাল ১১টার দিকে পরির্দশনে যান উত্তরের বিএনপির পরাজিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। এসময় রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি বস্তিতে বারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনার জন্য সরকারের মহলবিশেষকে দায়ী করেন। তিনি অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবি জানান। অপরদিকে, এ অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ ৪৫০টি পরিবারের তালিকা করেছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। প্রত্যেককে প্রাথমিকভাবে ৩০ কেজি চাল ও নগদ দুই হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম।

মহাখালী ২০ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর নাছির জানান, এখানে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। আপাতত তাদের খাওয়ার জন্য খিচুরি-শুকনো খাবার সরবরাহ ও থাকার জন্য স্থানীয় স্কুল ও কলোনির মাঠে ব্যবস্থা করা করেছেন। দ্রুতই তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন জানান, পানির স্বল্পতা আর সরু রাস্তার কারণে আগুন নেভাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। পানির গাড়িগুলো ঠিকমতো বস্তির ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। আগুনে কোনো হতাহত কিংবা নিখোঁজের খবর পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে আগুনের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।