পাঠাও শামীমের হত্যাকারীরা রাত হলেই ভয়ঙ্কর

image

আশুলিয়ার কাঠগড়ার পালোয়ানপাড়া বাঁশ ঝাড়ে পাঠাও রাইড চালক মো. শামীম বেপারী বাবুকে (২৮) হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১ সদস্যরা। গ্রেফতারকৃতরা হলো, মামুনুর রশিদ (২২), মাহবুবুর রহমান (২০) ও মোমিন মিয়া (২১)। সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে আশুলিয়া রুপায়ন মাঠ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে র‌্যাব। এসময় তাদের কাছ থেকে রক্তমাখা প্যান্ট উদ্ধার ও ছিনতাইকারী চক্রের চারটি মোবাইল ফোন জব্দ এবং নিহত শামীমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তবে নিহত শামীমের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করতে পারেনি র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, তারা দিনের বেলায় নামে মাত্র বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও রাত হলেই তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। অধিকাংশ সময় ছিনতাই শেষে ভিকটিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে নিরাপদে ফিরে যায়। এমনই ভাবে শামীমকে পরিকল্পিতভাবে গলাকেটে হত্যা করে তারা। গ্রেফতারকৃতরা ইতিমধ্যে আরও তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। সোমবার দুপুরে র‌্যাব-১ এর উত্তরা ব্যাটালিয়নে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল।

শাফী উল্লাহ বুলবুল জানান, চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে শামীম সবার ছোট। তার স্ত্রী ৮ মাসের অন্তঃসত্তা। পরিবারের অর্থ উপার্জনের একমাত্র ভরসা ছিল শামীম। শামীমের বাড়ি রাজশাহী জেলার বাঘা থানাধীন চৌমুধিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মো. শাহিন বেপারী। সে খিলগাঁও থানাধীন মেরাদিয়া মধ্যপাড়ায় তার স্ত্রীসহ বসবাস করত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করেছিল। পারিবারিক স্বচ্ছলতার জন্য নিজে একটি মোটরসাইকেল ক্রয় করে। পরে পাঠাও অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনের কাজ শুরু করে। একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে ভিকটিমের অন্তঃসত্তা স্ত্রী ও স্বজনরা শোকে হতবিহল হয়ে পড়ে।

শাফী উল্লাহ বুলবুল আরও জানান, তারা অন্যান্য ছিনাতাইকারীর মতো টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি ছিনতাই করে না। তারা শুধুমাত্র মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি, অটোরিকশার মত ছোট যানবাহন ছিনতাই করে থাকে। ছিনতাইয়ের জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। কখনো তারা সাধারণ যাত্রীবেশে আবার কখনো বিয়ের জন্য গাড়ি ভাড়া করার কথা বলে ছিনতাই করে থাকে। টার্গেট নির্ধারনের পর তাদের একজন যাত্রীবেশে চালককে নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যায়। যেখানে পরিকল্পিতভাবে অন্য সদস্যদের নিয়ে ছিনতাই করে থাকে। এক্ষেত্রে যাত্রীবেশে থাকা তাদের সহযোগী গাড়িতে উঠানোর পর মোবাইল ফোনে কথা বলার ফাঁকে কৌশলে তার অবস্থান ও গন্তব্য চক্রের অন্যান্যদের জানিয়ে দেয়।

গ্রেফতার মামুনুর রশিদকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী। প্রায় ৫ বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত। দীর্ঘ দিন যাবৎ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। গার্মেন্টে চাকরির পাশাপাশি রাতে এই চক্রটির নেতৃত্ব দেয়। তার দেওয়া তথ্য মতে, ঘটনার আগের দিন রাতে সে ভিকটিমের মোটরসাইকেলে করে গাবতলী থেকে আশুলিয়া যায় এবং তাকে টার্গেট করে। ঘটনার দিন আনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে আবার ভিকটিমের সাথে যোগাযোগ করে। তার মোটরসাইকেলযোগে গাবতলী থেকে আশুলিয়ায় পৌঁছে দিতে বলে। রাত ৮টার দিকে গাবতলী থেকে ৩শ’ টাকা ভাড়ায় কন্ট্রাকে আশুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা করে শামীম। রাত সাড়ে ৯ টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সে ভিকটিমকে সিগারেট খাওয়ার কথা বলে থামায় এবং তাকে কৌশলে রাস্তার পাশে বাঁশ ঝাড়ে নিয়ে যায়। এসময় সেখানে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা মাহবুব ও মোমিন শামীমের ওপর হঠাৎ আক্রমন করে। একপর্যায়ে শামীমকে গলা কেটে হত্যা করে।

মাহবুবুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, জামগড়া এলাকায় তার একটি চায়ের দোকান আছে। তার চায়ের দোকানে বসেই ছিনতাইয়ের সব ধরনের পরিকল্পনা করে থাকে। ঘটনার দিন শামীমের গলায় প্রথমে ছুরি দিয়ে সে আঘাত করে। এসময় অন্য আসামীরা শামীমকে হাত-পা চেপে ধরে এবং সে তার গলায় ছুরি চালায় বলে স্বীকার করে। গ্রেফতার মোমিন মিয়া জানায়, সে পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী। সে প্রায় ১১ বছর ধরে আশুলিয়া এলাকায় অবস্থান করছে। এই চক্রের হয়ে ছিনতাইকৃত গাড়ি বিক্রির কাজ করতো সে। ছোট ছোট কাজের সুবিধার জন্য তারা তাদের সদস্য সংখ্যা তিন জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ঘটনার দিন শামীমকে দুই পা চেপে ধরে হত্যাকান্ডে সে সহায়তা করেছে বলে স্বীকার করে।

র‌্যাব-১ এর অধিনায় আরও বলেন, এর আগেও তারা একাধিক ছিনতাই করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শামীমকে হত্যার পর আলমত ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ভেঙ্গে ফেলে এবং নিজেদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। এসময় আসামী মাহবুবুর রহমান এর ব্যবহৃত জ্যাকেটে রক্ত লেগে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে খুলে ফেলে দেয় এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও ঘটনাস্থলে ফেলে দেয়। শামীমকে হত্যা করার সময় ধস্তাধস্তির কারণে মোটরসাইকেলের চাবি হারিয়ে যাওয়ায় আসামীরা ঘটনাস্থলের পাশে রাস্তায় ফেলে যায়। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তারা মোটরসাইকেলটি নেয়নি। রাতে অন্য কোনও চক্র বা দুর্বৃত্তরা মোটারসাইকেলটি নিয়ে যায়। সেটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।