শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টাকারী পাগলা মিজান এখন ভালোই আওয়ামী মিজান!

image

ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের যেসব নেতারা এখন কোটিপতি তাদের অধিকাংশই অন্য দল থেকে এসেছেন। হাইব্রিড আওয়ামীলীগ হিসেবে পরিচত এসব নেতাদের কুকর্মে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা রীতিমতো বিব্রত। গত ১০ বছরে কমপক্ষে কয়েক হাজার লোক বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ফ্রিডম পার্টি থেকে আওয়ামীলীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অদিষ্ট হয়ে দলের সবচেয়ে বড় কান্ডারী হয়ে গেছেন। এদের একজন মোহাম্মদপুরের হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান। হোটেল বয় থেকে ফ্রিডম পার্টির দূর্ধষর্ষ ক্যাডার পাগলা মিজান শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও তিনি আওয়ামীলীগের মোহাম্মদপুর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। আগামী কাউন্সিলকে ঘিরে আওয়ামীলীগের বড় পদ পাওয়ার আশায় আছেন তিনি। ইতোমধ্যে মধ্যে গোয়েন্দারা তার বিরুদ্ধে চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। এসব তথ্য দলের শীর্ষ পর্যায়েও রয়েছে। আওয়ামীলীগের ব্যানার লাগিয়ে হাবিবুর রহমান মিজান গত ১০ বছরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, টেন্ডারবাজি করে এখন শত কোটি টাকার মালিক। অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব গ্রহনের পাশাপাশি সেখানে গড়েছেন বিলাশ বহুল বাড়ি এবং সম্পদের পাহাড়।

স্থানীয় ও আওয়ামীলীগ ও গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মিজান যখন পাগলা মিজান নামে পরিচিত ছিলো তখন মিরপুরে একটি হোটেলে বয় হিসেবে কাজ করতেন। এরপর ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসী হিসেবে তার কর্মকান্ড শুরু। বাহিনী গড়ে তুলে এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন। ১৯৯৪ সালে অভিবিক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড( বর্তমানে ঢাকা উত্তরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড) কমিশনার হন। কমিশনার নির্বাচিত হয়ে রাজণীতিতে সক্রিয় হন মিজান। এরপর বিএনপি এবং আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি বড় আওয়ামীলীগার হয়ে উঠেন। মোহাম্মুর আওয়ামীলীগে সাধারণ সম্পাদক তিনি। আগামী কাউন্সিলকে ঘিরে তিনি এখন আওমামীলীগের বড় পদ চান। অথচ ২০১৪ সালে আওয়ামলীগের সাধারন সম্পাদক হওয়ার সুবাধে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। মোহাম্মদপুর এলাকার আওয়ামীলীগের প্রবিন নেতা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আদমেদ গাইন ও তার স্ত্রীকে কুপিয়ে জখম করে পাগলা মিজানের বাহিনী। ওই সময় মিজান মোহাম্মদপুর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়। ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে সাভারে জোরা খুনের অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও তিনি একাধিক হত্যা মামলার আসামী ছিলেন। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর জমি দখল, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। অস্টেুলিয়ায় তার কয়েককোটি টাকা মূল্যের বাড়ি রয়েছে। তিনি নিজেও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মিজান ছিলেন ফ্রিডম পার্টির অস্ত্রধারী দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। ১৯৮৯ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে (শেখ হাসিনা) হত্যার উদ্দ্যেশে ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা যে হামলা করেছিলো ওই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন হাবিবুর রহমান মিজান। ১০ অক্টোবর শেখ হাসিনার বাসায় ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসী পরবর্তীতে বিএনপির সন্ত্রাসী হিসেবে খ্যাতি পাওয়া কাজল এবং কবিরসহ পুরো দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলো হাবিবুর রহমান মিজান। ধানমন্ডি ২০ নম্বর রোডের ওই বাড়িতে বর্তমানে ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকও ছিলো। ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা সে সময় বঙ্গবন্ধুর বাস ভবন লক্ষ করে এলোপাথারি গুলিও চালিয়েছেন। এ সময় সন্ত্রাসীরা বাসবন লক্ষ করে ব্যাপক বোমা নিক্ষেপ করে। তাদের উদ্যেশ ছিলো তৎকালীন আওমালীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। কিন্তু নিরাপত্তা কর্মীদের পাল্টা গুলিতে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে। ওই ঘটনায় সে সময় ধানমন্ডি থানায় শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু ৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলাটি অনেকটা ধামাচাপা পড়ে যায়। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা বিএনপির আশ্রয়ে গিয়ে নানা সুবিধা গ্রহণ করা পদে অধিষ্ট হয়। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি অভিযোগপত্র দেয়। ওই অভিযোগপত্রে লেফটেনেন্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আব্দুর রশিদ, মেজর (অবঃ) বজলুল হুদা, হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, নাজমুল, মাকসুদ, মুরাদসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দাখিল করে। ওই অভিযোগ পত্রে হাবিবুর রহমান মিজানকে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার উদ্যেশে হামলার ঘটনায় অণ্যতম পরিকল্পনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই চার্যশিটে হাবিবুর রহমান মিজানের ভাই মোস্তফাজিুর রহমান মোস্তফাকেও আসামী করা হয়।

সূত্র জানায়, ১৯৭৬ সালে ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে পাগলা মিজান, শামী জালালী ওরফে দারোগার ছেলে শামীম, বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুলসহ কয়েকজন লিবিয়া যান গেরিলা ট্রেনিং নিতে। দেশের ফেরার পর মিজান ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর জোনের ফ্রিডম পার্টির কো অর্ডিনেটর হন। তার নেতৃত্বে ওই এলাকায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, দখল, হত্যাসহ যাবতীয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলতো। শেখ হাসিনার উপর হামলার সময় মিজান ধানমন্ডি - মোহাম্মদপুর এলাকার ফ্রিডম পার্টির কো অর্ডিনেটরের দায়িত্বে ছিলেন।

সূত্র জানায়, দেশ স্বাধিনের পর থেকেই হাবিবুর রহমান মিজান ছিলেন অনেকটা বেপরোয়া। সে সময় সুঠম দেশের অধিকারী এবং তরুন মিজান মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আদাবরসহ আশেপাশের এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করেন। এক পর্যায়ে ছিনতাই করতে গিয়ে ১৯৭৫ সালে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পানিতে পড়েন। পুলিশ তাকে ধরতে গেলে সে বিবস্ত্র অবস্থায় উঠে নিজেকে পাগল হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। তখন পাগল ভেবে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আসলে সে পাগল ছিলো না। পরবর্তীতে পাগলা মিজান নামেই সে ফ্রিডম পার্টির দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে নিজের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। এক পর্যায়ে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি হাবিবুর রহমান মিজান নাম রাখেন ।

ক্ষমতার পালা বদলের শ্রোতে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে ক্ষমতায় আসার পর পাল্টে হাবিবুর রহমান মিজান নামে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেন। এক পর্যায়ে আওয়ামীলীগের কতিপয় নেতার মাধ্যমে আওয়ামলীগে অনুপ্রবেশ করেন। আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েই হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে ফ্রিডম মিজান অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেন। মোহাম্মদপুর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদও পেয়ে যান। আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর হামলা, জমি দখল, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে ১০ বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান।

১৯৯৬ সালে মোহাম্মদপুর থানায় ইউনুছ নামের এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তার নামে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৬ সালে সাভারে জোরা হত্যা মামলা হয় হাবিবুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে। মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্প দখল করে সেখানে, অস্ত্র, মাদক ব্যবসার বিস্তার গড়ে তোলেন হাবিবুর রহমান মিজান। তার নিয়ন্ত্রনে মোহাম্মদপুর, আদাবর ধানমন্ডি, কলাবাগান, মিরপুর বেরিবাধসহ আশেপাশের এলাকায় মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসাসহ অপরাধ জগতের যাবতীয় কর্মকান্ড চলে। সামনে আওয়ামীলীগের কাউন্সিলকে ঘিরে মোহাম্মদপুর এলাকায় আওয়ামীলীগের বড় পদের আশায় আছেন হাবিবুর রহমান মিজান।