সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত শিশুরা শারিরীকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও মানসিকভাবে সুস্থ হতে সময় লাগবে

image

রাজধানীর রূপনগরে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা ৭ শিশুর অবস্থা এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ওই ঘটনার কথা মনে হতেই হাসপাতালের বেডে বারবার আতঁকে উঠছে তারা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শারীররিকভাবে আহত হওয়ার পাশাপাশি আতঙ্ক ভর করেছে শিশুদের মনে। ফলে শারিরীকভাবে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে সুস্থ হতে সময় লাগবে।

ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. আলাউদ্দিন বলেন, আহত ৭শিশুর মধ্যে কেউ আশঙ্কামুক্ত নয়। তবে মিজান, জনি ও মোস্তাকিম নামের তিন শিশুর অবস্থা বেশি গুরুতর। বাকিরাও কেউ এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। এদের মধ্যে গুরুতর আহত জান্নাতের হাত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, বেলুন বিক্রেতা আবু সাইদ ও জুয়েলের শরীর ও হাতে ক্ষত আছে। ২৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া ৭ বছরের মোস্তাকিম ও ১১ বছরের সিয়াম বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে মোস্তাকিমের অবস্থাও গুরুতর। বৃহস্পতিবার মোস্তাকিমকে বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

শিশু মিজানের বাবা রোকন মিয়া জানান,মিজানের জ্ঞান ফিরতে শুরু করছে। ডাক দিলে সে তাকায়, ইশারা করে। কথা বলতে চায় কিন্তু পারে না, আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, সে এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে। ৭২ ঘণ্টা পার না হলে কিছুই বলা যাবে না। আহত মোস্তাকিন (৭)-এর বাবা মো. মফিজুর বলেন, ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়, ঘটনার দিন বিকালে। সে বাসা থেকে বের হয়ে বলে, বাবা আমি আসতেছি, এরপর আর কথা হয়নি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মফিজুর। মোস্তাকিন স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শেণির শিক্ষার্থী ছিল।

মোস্তাকিনের মা মিনু বেগম পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাদের মূল বাড়ি ফরিদপুর জেলার শালতা থানার আংরাইল গ্রামে। বর্তমানে রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তিতে থাকেন। শিশুটির বাবা একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করেন। ঘটনার সময় মা ছিলেন কর্মস্থলে। বাবা ছিলেন বাসায়। তার নাইট ডিউটি ছিল। তিনি বলেন, ছেলেটি স্কুল থেকে বাসায় আসে। কাপড় খুলে একটি হাফপ্যান্ট পড়ে। তখন আমি তাকে খেতে ডাকি। কিন্তু ছেলে আমাকে বলছিল, বাবা আমি আসছি। এই বলে বাইরে চলে যায়। এর কিছু সময় পর হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ। ভাবলাম হয়তো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ হয়েছে। কিছু সময় পর সংবাদ পাই, সেখানে গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেছে। তখন দ্রুত বের হয়ে ওকে আর খুঁজে পাইনি।

পরে শুনি আমার ছেলেও আহত হয়েছে। স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। পরে দেখতে পাই একজন লোক তাকে সিএনজি অটোরিকশায় তুলছেন। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেখানে দুইজন বললো, এখানে ভালো চিকিৎসা হবে না। চলুন অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন আমি বুঝে উঠতে পারিনি। তাদের মাধ্যমে চলে যাই নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালে। পরে সেখানে গিয়ে বুঝতে পারি, হয়তো আমি দালালের খপ্পরে পড়েছি। সেখান থেকে আবার তাকে নিয়ে আগারগাঁও চক্ষু হাসপাতালে যাই। পরে সেখান থেকে বৃহস্পতিবার ফের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে তাকে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ক্ষত ছাড়াও শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। মো. মফিজুর বলেন, অভাবের সংসারে ছেলের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ছেলেটি কথা বলতে পারছে না। বিছানায় সটফট করছে। আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।

এ ঘটনায় ঢামেকে চিকিৎসাধীন ৭জনের মধ্যে দুইজন বার্ন ইউনিটের এইচডিইউ-তে ভর্তি রয়েছে। আবাসিক চিকিৎসক ডা. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, আহতদের কেউই ঝুঁকিমুক্ত নয়। আহত শিশুদের পরিবারগুলো খুবই দরিদ্র। তারা দিন আনে দিন খায়। কারও বাবা রিকশাচালক, কারও বাবা দিনমজুরের কাজ করেন। পরিবারগুলো এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের আর্থিক সহায়তা পায়নি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর যে শিশুদের বাসায় নেওয়া হয়েছে তাদের পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতেও হিমশিম খাচ্ছে। প্রসঙ্গত, ৩০ অক্টোবর বুধবার বিকাল তিনটার দিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত ৭জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। বাকি দুই জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা যায়। এ ঘটনায় বেলুনওয়ালা আবু সাইদকে আটক করেছে পুলিশ। অবৈধ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা এবং নরহত্যার অভিযোগে তার নামে রূপনগর থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।