অনুসন্ধানের তথ্য অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করায় খন্দকার এনামুল বাছির সাময়িক বরখাস্ত : দুদক চেয়ারম্যান

image

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশের ডিআইজি (বরখাস্ত) মোঃ মিজানুর রহমানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া এবং গাড়ি উপহার চাওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ) খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে দুদক কমিশন। ১০ জুন সোমবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলাকালে দায়মুক্তি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ নেওয়া ছাড়াও কমিশনের তথ্য পাচার ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “অনুসন্ধানের তথ্য অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করায় চাকরির শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হল। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে আলাদা একটি বিভাগীয় তদন্ত করা হবে।

দুদক পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টচার্য জানান, অবৈধভাবে কমিশনের তথ্য পাচার এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িকভাবে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করেছে দুদক। একটি বেসরকারী টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি অনুসন্ধান হতে তাকে দায়মুক্তি দিতে তার নিকট ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণে সমঝোতা করেন। তিনি ৪০ লাখ টাকার মধ্যে ২৫ লাখ টাকা ঢাকার রমনা পার্কে, বাজারের ব্যাগে করে ডিআইজি মিজানুর রহমানের নিকট হতে গ্রহণ করেন এবং অবশিষ্ট ১৫ লাখ টাকা পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে পাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য তিনি গ্যাস চালিত একটি গাড়ি দাবি করেন। এছাড়া তিনি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবৈধভাবে পাচার করেন। প্রচারিত প্রতিবেদনটি কমিশন আমলে নিয়ে ৯ জুন রোববার দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্ত এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিশন এই কমিটিকে সোমবার বেলা ৩ টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ প্রদান করে। কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক এই কমিটি সোমবার কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করে । প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে কমিশন, দুদকের তথ্য অবৈধভাবে পাচার, চাকুরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ সর্বোপরি অসদাচরণের অভিযোগে পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চাকুরি হতে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।

সূত্রে জানা যায়, পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে দায়মুক্তি দিতে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার জন্য ‘চুক্তি’ সংক্রান্তে কথাবার্তার অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য দুদকের পক্ষ থেকে কমিশনের সচিব দিলওয়ার বখ্তকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় । কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন, লিগ্যাল অনুবিভাগের মহাপরিচালক মফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান। কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই খন্দকার এনামুল বাছিরকে সোমবার সাময়িক বরখাস্ত করেছে কমিশন। খন্দকার এনামুল বাছির ১৯৯১ সালে অ্যান্টি করাপশন অফিসার (এসিও) হিসেবে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে যোগ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হওয়ার পর তিনি সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক ও পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। পরিচালক হিসেবে তিনি অনুসন্ধান ও তদন্ত অনু বিভাগ ১ এর দায়িত্বে ছিলেন। পরে তিনি পরিচালক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ভিভাগের দায়িত্বে যান ৬ মাস আগে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে পুলিশের উচ্চপদে থেকে তদবির, নিয়োগ, বদলিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের (২০১৮) ১০ ফেব্রুয়ারি কমিশনের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছরের ৩ মে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে সম্পদ বিবরনী দাখিলের জন্য নোটিশও করেন ফারিদ আহমেদ পাটোয়ারী। দুদকে হাজির হয়ে সম্পদ বিবরনী দাখিল করে ডিআইজি মিজান নিজেকে নির্দোষ দাবী করেন। পরে ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে বাদ দিয়ে পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় কমিশন। গত বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া এক নারী সংবাদ পাঠিকাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আসে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ ওঠার পর তাকে ডিএমপি থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়।

ডিআইজি মিজান (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) জানান, তার বিরুদ্ধে দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হলে তিনি দুদকে সম্পদ বিবরনী দাখিল করেন। প্রথম অনুসন্ধান কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীর কাছে তিনি বলেন, ট্যাক্স ফাইলের বাইরে তার কোন সম্পদ নেই। থাকলে যেকোন ব্যবস্থা তারা নিতে পারেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় অনুসন্ধান কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাত হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে । তিনি এনামুল বাছিরের সঙ্গে দেখা করতে দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে যান। ওই দিন অনুসন্ধান কর্মকতা আমাকে বলেন, আমার মোবাইল নাম্বার নিয়ে যান অথবা আমাকে একটি ফোন কিনে দেন। অনুসন্ধান কর্মকর্তার কথা মতো আমি ২ হাজার টাকা দিয়ে একটি মোবাইল কিনে দেই। ওই মোবাইলে ব্যবহারের জন্য ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নাম্বারের একটি সিম কিনে দেই। সিমটি আমার বর্ডিগার্ড হৃদয়ের নামে নেওয়া। নাম্বারসহ মোবাইল তার কাছে পৌছে দেওয়ার পর ওই মোবাইলে অনুসন্ধান কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলতেন, ম্যাসেজ দিতেন।

বরখাস্ত হওয়া অনুসন্ধান কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছির দাবী করেন, অভিযোগ সংশ্লিস্ট ডিআইজি মিজানের সঙ্গে টাকা চাওয়া কোন কথাবার্তা হয়নি। ডিআইজি মিজান ছাড়াও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান করতে গত ৩০ মে অনুসন্ধান কর্মকর্তা পুলিশ প্লাজায় গিয়েছেন।