ওসি’র কাণ্ড : চাকরির প্রলোভনে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণের পর ভালোবাসা ও বিয়ের প্রলোভনে লাগাতার ধর্ষণ ও গর্ভপাত

image

নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হককে সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বরখাস্তকালীন তিনি ডিএমপির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দফতরে সংযুক্ত থাকবেন। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগ থেকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অনুসন্ধান তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মতিঝিল বিভাগের এক এডিসির নেতৃত্বে এ অনুসন্ধান তদন্ত করা হয়। তাদের তদন্ত রিপোর্ট ভিডিওসহ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নির্যাতিত ওই মেয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রথমে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আইজিপি বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। ওই আবেদনে মাহমুদুলের অপকর্ম তুলে ধরা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সোমবার রাতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

পুলিশের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে নওগাঁ থেকে এক মেয়েকে চাকরি দেয়ার লোভ দেখিয়ে ঢাকায় ডেকে নিয়ে আসেন। এরপর তাকে রাজধানীর হোটেল ক্যাপিটালে নিয়ে যান। সেখানে ওই মেয়েকে খাবারের সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে তাকে ধর্ষণ করেন। এরপর জ্ঞান ফিরলে মাহমুদুল বলেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। বিয়ে করতে চাই। মেয়েটি কোন উপায় না পেয়ে বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হয়। মাহমুদুল প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সে ওই মেয়ের সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। এভাবে ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর মেয়েটি অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়ে। মাহমুদুল বাচ্চা নিতে রাজি না থাকায় এ নিয়ে মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে মাহমুদুল মেয়েটিকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করে। মেয়েটি তাকে বিয়ে করতে চাপ সৃষ্টি করে। গত ২ এপ্রিল যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে মেয়েটি কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে মাহমুদুলের পল্টনস্থ কর্মস্থলে যায়। পল্টন থানার অনেকেই বিষয়টি জানলেও ওসির ভয়ে সবাই চুপ থাকে। একপর্যায়ে মেয়েটি পুরো ঘটনা মাহমুদুলের বাবাকে জানালে তিনি তা মেনে নেন। কিছুদিন পর ওসির বাবাও মেয়েটি ও তার পরিবারকে হুমকি দেন। মেয়েটি যদি তার ছেলের জীবন থেকে সরে না যায়, তাহলে তার চাকরি বাতিল করবেন বলেও হুমকি দেন। এ হুমকির পর কোন উপায় না পেয়ে ওই নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এরপর গত ১২ এপ্রিল আত্মহত্যার জন্য ২০টি ঘুমের ট্যাবলেট খায়। ১২ এপ্রিল রাতেই তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই রাতে মেয়েটির পরিবারকে পুরো বিষয়টি নিয়ে ওসির বাবা উল্টো হুমকি দেন। বলেন, তারা যেন ওসিকে বিরক্ত না করেন। আর যদি বিরক্ত করেন, তা হলে মেয়ে ও তার পরিবারের ক্ষতি হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। এরপর মেয়েটি চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে আবার ওসির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে বিয়ে করতে বলেন। আর বিয়ে না করলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তখন ওসি উল্টো মেয়েটিকে হুমকি দিয়ে টাকার গরম দেখান। তিনি পল্টন থানার ওসি। তার অনেক চেনাজানা, অনেক টাকা, অনেক ক্ষমতা, অনেক কিছু ধামাচাপা দিতে পরেন। ওই নারী বলেন, তার কর্মস্থলে সমস্যা ও বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাকে ওসি বউ হিসেবে গ্রহণ না করলে মৃত্যু ছাড়াও অন্য উপায় থাকবে না বলে আইজিপির কাছে অভিযোগ করেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা প্রকাশ্য ও গোপনে অনুসন্ধান করে এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য, ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র পর্যালোচনা করে জানতে পারেন, অভিযুক্ত মাহমুদুল হক অফিসার ইনচার্জ পল্টন থানা ও মেয়ের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। উভয়ের বাড়ি একই জেলায় হওয়ায় প্রায় ৩ বছর আগেই ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সুবাধে তাদের মধ্যে প্রথমে কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ, একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর তারা মোবাইল ফোন, ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকখন, চ্যাট করা শুরু করে। শুধু তা না তারা ঢাকা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘোরাফেরা, রাত কাটানোসহ অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। পরে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হওয়ায় গত ২ এপ্রিল থেকে অভিযুক্ত ওসি মাহমুদুল হকের সঙ্গে মেয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। গত জুন থেকে এক তরফাভাবে অভিযুক্ত ওসির সরকারি মোবাইলে ৪ হাজার এসএমএস পাঠান। তা তার সিডিআর পর্যালোচনা করে জানা গেছে। এছাড়া তার মোবাইল ফোনে ধারণকৃত অনেক ভিডিও, মেসেঞ্জারে কথোপকথনের স্কিনশর্টসহ নানা তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ভিডিওতে ওসি মাহমুদুল হক পুলিশের পোশাক পরা অবস্থায় সরকারি ওয়্যারলেসসেট কাছে থাকাবস্থায় দেখা গেছে। অপরটিতে পোশাকবিহীন অবস্থায় স্বেচ্ছায় অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। ওসি পল্টন তদন্ত কমিটিতে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু পন্টন থানাধীন হোটেল ক্যাপিটালে খাবারের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে অচেতন করার প্রমাণ পাওয়া না গেলেও হোটেল ম্যানেজোরের মাধ্যমে জানা গেছে, ৩১৫ ও ৭১৭ নম্বর রুমটি প্রতি মাসে এক বা একাধিকবার ছুটির দিন ওসির নামে বুকিং ছিল। এ বিষয় সত্যতা পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০১৯ সালে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ওসির নামে হোটেল বুকিং ছিল।

মাঠ পর্যায়ের তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের তদন্তের মতামতে বলেছেন, পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর সদস্য একজন অবিবাহিত মেয়ের সঙ্গে হোটেল ক্যাফেটারিয়ায় যে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তা বিভাগীয় নিয়মশৃঙ্খলা পরিপন্থী, অসদাচরণ, অপেশাদারিত্ব ও নৈতিক শৃঙ্খলনের চরম বহিঃপ্রকাশ।

এ সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কয়েক কর্মকর্তা বলেন, তার এ কেলেঙ্কারির দায়িত্ব পুলিশ বাহিনী নেবে না। তার বিরুদ্ধে ২-১ দিনের মধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে প্রক্রিয়াধীন। নির্যাতিত মেয়েটির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এ সম্পর্কে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে এআইজি (মিডিয়া) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। তাই বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে রাতে আবার টেলিফোন করলে এক কর্মকর্তা বলেন, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার দায়িত্ব পুলিশ বাহিনী নেবে না। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিষয়টি নিয়ে পল্টন থানার অভিযুক্ত ওসি মাহমুদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।