থমকে আছে পাপিয়ার মামলার তদন্ত ও অণুসন্ধান

image

নরসিংদি যুব মহিলালীগের সাবেক নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার চার্যশিট জমা পড়লেও অবৈধ সম্পদ অর্জন, মাদক এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও অণুসন্ধান থমকে আছে। ১ মার্চ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান শুরু করলেও তা ৩ মাসেও শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অপরদিকে মাদক এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে করোনার কারণে পাপিয়া ও তার স্বামীকে রিমান্ড হেফাজতে পেয়েও জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করতে পারেনি। গত ২৯ জুন পাপিয়ার ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলাটির চার্যশিট আদালতে জমা পড়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনুসন্ধান শেষ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে পাপিয়ার বিরুদ্ধে নামে বেনামে অবৈধভাবে ৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। তবে পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারার কারণে এ বিষয়ে চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না দুদক।

এ বিষয়ে দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত ২ এর পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন সংবাদকে জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে তদন্ত অনেকটা থমকে আছে। তবে দুদক টিম পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের একটি হিসেবে পেয়েছে। ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার তথ্য থাকলেও কিছু নথিপত্র এখনো হাতে পায়নি দুদক। তবে তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি একটু উন্নত হলেই দুদক অনুসন্ধানের শেষ কাজটুকু করে ফেলতে পারবে। তখন একটি মামলা করবে দুদক। মামলার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে দুদক।

দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানায়, পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করার আগেই করোনার প্রার্দুভাব শুরু হয়ে যায়। এ কারণে অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অভিযোগে পাপিয়া ও তার স্বামীকে দুদকের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। অণুসন্ধানে নেমে দুদক পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত যেসব রেকর্ডপত্র পেয়েছে সেগুলো পুরোপুরি যাচাই বাচাই করা সম্ভব হয়নি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে পাপিয়াকে জ্ঞিসাবাদের জন্য নেওয়ায় দুদক সে সময় পাপিয়া ও তার স্বামীকে দুদকে আনতে পারেনি। আর ওই সময় পাপিয়ার দু দফা করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার খবর শোনার কারণেও এ বিষয়ে কোন ঝুকি নেয়া হয়নি।

সূত্র জানায়, বিদেশে অর্থপাচারসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চলতি বছরের ১ মার্চ পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধানে মাদক ব্যবসা, জাল টাকার ব্যবসা, অনৈতিক কর্মকান্ডে কোটি টাকার সম্পদপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়েছে পেয়েছে দুদক। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পাপিয়া ও তা স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী, সাব্বির আহমেদ ও শেখ তায়্যিবাকে অর্থপাচার ও জাল মুদ্রা রাখার অভিযোগে আটক করে র‌্যাব। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাসায় ও হোটেলে অভিযান চালিয়ে বিদেশি মদ, পিস্তল, গুলি ও প্রায় ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর থানায় আলাদা তিনটি মামলা হয়। এসব মামলায় ডিবি র‌্যাব ও সিআইডির হেফাজতে কয়েকদফা রিমান্ডে যায় এ দম্পতি। সুনির্দিষ্ট পেশা না থাকা সত্ত্বেও তারা স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পত্তি ও অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছে। ফার্মগেট এলাকাস্থ ২৮ ইন্দিরা রোডে তাদের ২ টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদী শহরে ২ টি ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি ও নরসিংদীর বাগদী এলাকায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ২ টি প্লট আছে রয়েছে । এছাড়াও তেজগাঁও এফডিসি গেট সংলগ্ন এলাকায় অংশীদারিত্বে তাদের ‘কার একচেঞ্জ’ নামক গাড়ির শো রুমে প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে এবং নরসিংদী জেলায় ‘কেএমসি কার ওয়াস এন্ড অটো সলিউশন’ নামক প্রতিষ্ঠানে ৪০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ আছে । এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের নামে-বেনামে অনেক এ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমান অর্থ গচ্ছিত আছে । র‌্যাবের তদন্তে পাপিয়া ও তার স্বামী অধিকাংশ সময় রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করেছে বলে জানা যায়। সবশেষ গত ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর থেকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত তারা বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৫৯ দিন হোটেল ওয়েস্টিনের কয়েকটি বিলাসবহুল রুমে অবস্থান করে বলে তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। প্রায় ২ মাসে তারা হোটেলে ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ টাকা নগদ বিল পরিশোধ করে। প্রাথমিক তদন্তে র‌্যাব জানতে পারে শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী নরসিংদী এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজী, চাকুরী দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারনা, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স প্রদান, গ্যাস লাইন সংযোগ ইত্যাদির নামে সাধারণ মানুষের নিকট হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে। এই পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে পুলিশের এসআই ও বংলাদেশ রেলওয়েতে বিভিন্ন পদে চাকুরী দেওয়ার নামে মোট ১১ লক্ষ টাকা, একটি কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কথা বলে ৩৫ লক্ষ টাকা, একটি সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স করে দেওয়ার কথা বলে ২৯ লক্ষ টাকাসহ ঢাকা ও নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পাপিয়ার আয়কর ফাইল তলব করে দেখা যায়, সেখানে সে বছরে ২২ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন। অথচ তার প্রতিদিন বারের বিলই আসে আড়াই লাখ টাকা।