ফ্রিডম পার্টি থেকে উত্থান যুবলীগ নেতা খালেদ ভূঁইয়ার

image

প্রথমে ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার, এরপর ছাত্রদলের নেতা। ছাত্রদল থেকে যুবলীগে যোগদান করেই পদ পেয়ে যান খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে ক্যাসিনো (জুয়ার আসর) পরিচালনার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত এবং একাধিক হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকা ও ডাকাতি মামলার আসামি হয়েও খালেদ কিভাবে যুবলীগের পদ পেয়েছে তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অস্ত্রব্যবসা, মাদক, টেন্ডারবাজি, চাঁদাাবজিসহ সব অপকর্মেই জড়িত ছিল খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। খালেদের অপকর্মের সহযোগী ছিল ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা। এমনকি বিদেশে অবস্থানকারী পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গেও রয়েছে খালেদের সখ্যতা এবং বাণিজ্য। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি অংশ ছিল খালেদের নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থপাচারের অভিযোগে গুলশান থানায় ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় খালেদকে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের রিমান্ড হেফাজতে আনার আবেদন জানিয়ে পুলিশ আদালতে পাঠিয়েছে তাকে। এর আগে রাতভর র‌্যাব হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে খালেদ ভূঁইয়াকে বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব ৩।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে যুবলীগ নেতা বনে যাওয়া খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার উত্থান আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো। যুবলীগের পদ পাওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ করত খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার পাশাপাশি অবৈধ জুয়ার আসর থেকে খালেদের প্রতিমাসে আয় ছিল কোটি টাকারও বেশি। এসব অর্থ বিদেশে পাচার করত খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ডজনখানেক হত্যা মামলার আসামি হলেও যুবলীগের পদধারী হওয়ায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গুলশানের উপপুলিশ কমিশনার সুদীপ চক্রবর্ত্তী জানান, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে র‌্যাবের পক্ষ থেকে। মামলায় খালেদকে গ্রেফতার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞসাবাদের জন্য রিমান্ড হেফাজতে আনার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। মামলাগুলো পুলিশ বিভাগ তদন্ত করবে। র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, ফকিরাপুলে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) হাতে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া দেশ ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করেছিল। বিদেশে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে খালেদের সখ্য ছিল। রাজধানীতে অস্ত্র, মাদক এবং জুয়ার আসর পরিচালনা করে যে অর্থ পেতেন তার একটি ভাগ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছেও পাঠাতেন। এছাড়া তার নিয়ন্ত্রিত ক্যাসিনো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য, রাজনৈতিক নেতারাও ভাগ পেত। বুধবার গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাবের কাছে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো থেকে শুরু করে কমপক্ষে সাতটি সরকারি ভবনে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি জমি দখলের মতো নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের পর রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণে নেয় এই যুবলীগ নেতা খালেদ। এরমধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়াং ম্যানস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাসিনোতে চলে জুয়া। সেখানে মাদকের ছড়াছড়ি। পাওয়া যায় ইয়াবাও। খিলগাঁও-শাহজাহানপুর হয়ে চলাচলকারী লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে নিয়মিত টাকা দিতে হয় খালেদকে। প্রতি কোরবানির ঈদে শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। খিলগাঁও রেল ক্রসিংয়ে প্রতিদিন রাতে মাছের একটি হাট বসান এই নেতা। সেখান থেকে মাসে কমপক্ষে এক কোটি টাকা আদায় করেন তিনি। একইভাবে খিলগাঁও কাঁচাবাজারের সভাপতির পদটিও দীর্ঘদিন তিনি ধরে রেখেছেন। শাহজাহানপুরে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান ও ক্লাব নির্মাণ করেছেন। মতিঝিল, শাহজাহানপুর, রামপুরা, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ যুবলীগ নেতা খালেদের হাতে। এসব এলাকায় থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রেলভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার ফকিরাপুল জোনসহ বেশিরভাগ সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে। ‘ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া’ নামের প্রতিষ্ঠানটি দিয়ে সে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই প্রতিষ্ঠানের নামেই অধিকাংশ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যুবলীগ নেতা খালেদের বাড়ি কুমিল্লা। কলেজে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের গুলিতে তার একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই তাকে ল্যাংড়া খালেদ নামেই অনেকে চেনেন। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম রাসুর নেতৃত্বে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা হয়। এই দুই নেতার হাত ধরেই খালেদের উত্থান। ২০০২ সালে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল খালেদ। ২০১১ সালে মোহাম্মদপুরে ঢাকা মহানগর উত্তরে সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বাবু ওরফে লীগ বাবু খুন হয়। ওই খুনের সঙ্গে খালেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। দুবাইয়ে আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। দুবাই ও সিঙ্গাপুরে জিসানের সঙ্গে যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতাসহ খালেদকে চলাফেরা করতেও দেখেছেন অনেকে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সিঙ্গাপুরে হোটেল মেরিনা বেতে জিসান, খালেদ ও যুবলীগের ওই শীর্ষ নেতার মধ্যে ক্যাসিনো এবং ঢাকার বিভিন্ন চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে জিসান তাদের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। এ নিয়েই খালেদ ও যুবলীগের ওই শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যার প্রেক্ষিতে যুবলীগের ওই শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দিতে একে-২২ রাইফেলসহ ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও আনে খালেদ। যে অস্ত্রগুলো পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে।

গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটটসহ পাঁচ জন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সকালের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়তে চেয়েছিল। ভোরে তারা সে উদ্দেশ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও যায়। কিন্তু বিমানবন্দরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আতঙ্কে ফিরে আসে। ফেরার পথে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ পাঁচ জন একসঙ্গেই ছিল। পরে দুপুরের দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গিয়ে যে যার মতো আলাদা হয়ে যায়। সেখান থেকে খালেদ বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে ফিরে যায় তার বাসায়। সেখান থেকে সম্রাট কাকরাইলে নিজ অফিসে অবস্থান নেয়। গ্রেফতার এড়াতে দের শতাধিক ক্যাডার বাহিনীর পাহাড়ায় কাকরাইলের অফিসেই অবস্থান নিয়ে থাকে সম্রাট। আর খালেদ চলে যায় তার বাসায়। বাসা থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার কথা থাকলেও র‌্যাব তার বাসা ঘিরে ফেলায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া আর বের হতে পারেনি। পরে র‌্যাব তার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও নগদ অর্থ পায়। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

ভারতে পলাতক বিএনপিপন্থি পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার। সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরায় তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুবাইয়ে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে। তার সহযোগিতা নিয়ে টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে খালেদ। সেই টাকার ভাগ নিয়মিত পৌঁছে যেত জিসানের কাছে। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ খালেদের অবস্থান প্রমাণে সিঙ্গাপুরের অভিজাত হোটেল মেরিনা বের সুইমিংপুলে জিসান ও খালেদের সাঁতার কাটার ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টার প্রতিপক্ষ গ্রুপ রাজধানীর বিভিন্ন দেয়ালে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের আশির্বাদ থাকায় খালেদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, একসময় টেন্ডারবাজির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে জিসানের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হয় তার। পরে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে সখ্য তৈরি করে জিসানের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে নেন। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জিসানের বেশকিছু ক্যাডার ধরিয়ে দেন খালেদ। বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। এ ঘটনায় জিসানের সঙ্গে খালেদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ফলে খালেদ নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় খালেদ অস্ত্রধারী দেহরক্ষী সঙ্গে নিয়ে সবসময় চলা ফেরা করত। নিজের নামে একাধিক অস্ত্রের লাইসেন্স নিলেও এর আড়ালে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলে খালেদ। এসব অস্ত্র যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নিজের অনুসারীদের কাছে হস্তান্তর করতেন। সম্প্রতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে খালেদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে দু’জনের মধ্যে বৈঠকও হয়। থাইল্যান্ডে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবীর সঙ্গেও রয়েছে খালেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। খালেদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, থাইল্যান্ডে পলাতক মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবী খালেদের ব্যবসায়িক অংশীদার। ব্যাংককে একটি টু-স্টার মানের হোটেল ও পাতায়াতে ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে খালেদের। এসব দেখভাল করে নবী। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অভিজাত সুপারমল প্যাভেলিয়নের ওপর ১১ কোটি টাকায় অ্যাপার্টমেন্ট কেনে খালেদ। স্কটল্যান্ডেও আছে বাড়ি। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পরিবার নিয়ে ঘনঘন যাতায়াত করে। সেখানে বিনিয়োগ ভিসায় স্থায়ীভাবে পরিবার নিয়ে থাকার প্রস্তুতিও নেয়া হয়।