বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে গিয়ে প্রতারণার শিকার

image

আগে দেশে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে টাকা পাঠানো হতো। তখন স্বজনরা টাকা পেতে অনেক সময় লাগত। গ্রাহকরা অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হয়। পিয়ন বা পোস্ট মাস্টার টাকা নেই বলে ঠিক সময় গ্রাককে টাকা দিতে সমস্যা করতেন। কিন্তু আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিকাশের মাধ্যমে খুব সহজে কয়েক মিনিটের মধ্যে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব কিছুতে গতিশীলতা আসে। আর স্বজনদের কাছে অল্প সময়ে টাকা পৌঁছে যাওয়ায় অনেকেই খুশি। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র পরস্পর যোগ সাজশে সরল সহজ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের গোপন পিন নম্বর বা মোবাইলে ফোন করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিদিন এমন বহু অভিযোগ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগে দেয়া হয় । আবার অনেকেই থানায় জিডি বা মামলা করছে। সাইবার টিমের অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অনুসন্ধান তদন্ত করে আসামি শনাক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। বহু প্রতারণার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। তারপরও অহরহ বিকাশে টাকা পাঠাতে নানা প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগে একজন সরকারি চাকরিজীবী লিখিত অভিযোগ করে বলেন, তিনি পুরনো ঢাকার চক বাজার এলাকা বাসিন্দা, তার ব্যবহ্নত মোবাইল ফোন নম্বরটি বিকাশ অ্যাকাউণ্ট করা। তার মোবাইল ফোন নম্বরে সম্প্রতি একজন অপরিচিত ব্যক্তি নিজেকে জুয়েল হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফোন করে বলেন, আমি মহাখালী বিকাশ প্যারাগন হাউজ থেকে বলছি। আপনার বিকাশ নম্বরটি মোট ৩জন লোক ব্যবহার করছে। সে কারনে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী ২০০টি নম্বর বন্ধ করে দিয়েছেন। আর সেটা ঠিক করার জন্য আমাকে (প্রতারক) আপনার নম্বরে ফোন দিতে বলেছেন। এরপর ওই প্রতারক কৌশলে ওই চাকরিজীবীর বিকাশ অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর চায়। ওই চাকরিজীবী সরল বিশ্বাসে তার বিকাশ অ্যাকাউন্টের পিন নম্বরটি জুয়েল পরিচয়দানকারী প্রতারককে সরল বিশ্বাসে জানিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখেন তার অ্যাকাউন্টে থাকা ৯ হাজার ৮৪০ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে গেছে। ঘটনার এক দিন পর আবার গোপন পিন নম্বর ব্যবহার করে তার অ্যাকাউন্ট থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। এভাবে কয়েক দফায় গোপন পিন নম্বর প্রতারণা করে ২৩ হাজার ৯৬৫ টাকা প্রতারক চক্র নিয়ে গেছে।

ওই চাকরিজীবী পুলিশের সাইবার বিভাগের কাছে লিখিত অভিযোগে বলেন, জুয়েল পরিচয়দানকারী ওই প্রতারক বিকাশ কোম্পানির অসাধু লোকজনের সহায়তায় এবং দুর্বল নিরাপত্তার কারনে তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট হতে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতারক চক্র নিজের পরিচয় গোপন করে প্রতারণার উদ্দেশে ছদ্মবেশ ধারণ করে আইন বহির্ভূত ট্রানজেকশন করে তার একাউন্টে থাকা টাকা হাতিয়ে নেয়। অপরদিকে রাজধানীর কমলাপুর এলাকার বিকাশ এজেন্ট ও মোবাইল ফোনে ফ্লাক্সি লোড করা একজন ব্যবসায়ী মতিঝিল থানায় লিখিত অভিযোগ করে বলেন, ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তার কমলাপুরস্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসা অবস্থায় একজন মহিলা কাস্টমার দোকানে গিয়ে তার কাছে অন্য সব মালামাল কিনতে চায়। ওই সময় তার বিকাশের ব্যবসায় ব্যবহ্নত এজেন্ট মোবাইল ফোন সেটটি দোকানের টেবিলের সামনের দিকে রেখে মহিলা কাস্টমারকে মালামাল দেয়। মহিলা কাস্টমার চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ পর অন্য লোক বিকাশ করতে দোকানে গেলে দোকান মালিক তার মোবাইল ফোন নম্বরটি আর খুঁজে পায়নি। পরে দোকানে ও আশপাশে বহু খোঁজাখুঁজির পরও মোবাইল ফোনসেট ও বিকাশ সিমটি খুঁজে আর পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে মতিঝিল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পরবর্তীতে ওই ব্যবসায়ী তার সিমটি রিপ্লেস করে দেখতে পায় তার বিকাশ নম্বরে থাকা ১ লাখ ২২ হাজার টাকা নেই। ওই ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগে বলেন, তার বিকাশ এজেন্টের মোবাইল ফোনটি দোকান থেকে চুরি করে এবং বিকাশ পিন ব্যবহার করে ওই টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন।

ডিএমপি সাইবার সিকিউরিটি বিভাগে বিকাশ প্রতারণার মামলার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তারা বলেন, বিকাশ এজেন্ট থেকে প্রতারণা করে পিন কোড নিয়ে কৌশলে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়া হয়। অনেক সময় বিকাশ এজেন্ট দোকানের সামনে প্রতারক চক্র মোবাইল ফোনের ছবি ওপেন করে দাঁড়িয়ে থাকে। কৌশলে ফোন নম্বর ও পিন কোড নম্বর নিয়ে পরে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর নম্বরে ফোন করে বলে, আপনার নম্বরে ভুলে কিছু টাকা পাঠানো হয়েছে। পরে তাকে আরেকটি নম্বর বা ম্যাসেজটি রিপ্লেস করার তথ্য শিখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে পাঠানো টাকা হাতিয়ে নেয়। এভাবে বিকাশ প্রতারক চক্রের একাধিক গ্রুপ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপ সৃষ্টি করে জাল জালিয়াকিতর মাধ্যমে বহু সহজ সরল মানুষের বিকাশে পাঠানো টাকা হাতিয়ে নেয়। বিকাশ কর্তৃপক্ষ কখনও এভাবে ফোন করে না বা পিন নম্বর চায় না। সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র এ সব অপকর্ম করে। এটা সাইবার অপরাধ। জনমনে সাইবার অপরাধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়লে সাইবার অপরাধ কমবে বলে সাইবার বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তারা আশাবাদী।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও বলেন, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র কৌশলে বিকাশের দোকান থেকে ট্রানজিকশন করা রেজিস্ট্রেশন খাতার ছবি মোবাইলে তুলে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে টাকার গ্রহণকারী ব্যক্তির কাছে ফোন দিয়ে বলে আপনার একাউন্টে ভুলে কিছুক্ষণ আগে (৫ হাজার) হাজার টাকা দুইবার সেন্ট করা হয়েছে। আপনার পিন নম্বরটি দিন। এ ভাবে পিন নম্বর নিয়ে প্রতারণা করে পুরো টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।