নোয়াখালীর সুবর্ণচরে : খন্ডিত লাশের রহস্য

মাকে নৃশংসভাবে হত্যার পর কসাই দিয়ে ৫ টুকরা করা হয়

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা চরজব্বর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের নূরজাহান বেগম (৫৭) নামে এক নারীকে পাঁচ টুকরা করে হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। ছেলে হুমাযুনসহ তার ৭ সহযোগী মিলে মা নূরজাহানকে হত্যা করে কসাইকে দিয়ে ৫ টুকরা করে টুকরাগুলো পাওনাদারদের ধান খেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে।

এ হত্যার ঘটনায় প্রথমে ভিকটিমের ছেলে হুমায়ুন কবির হুমা (২৮) বাদী হয়ে চরজব্বার থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। মামলার সূত্র ধরে পুলিশ তদন্তে নামলে হত্যার সঙ্গে সরাসরি সন্তানের জড়িত থাকার বিষয়টি ওঠে আসে। একই সঙ্গে তার ৭ সহযোগী মিলে এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে নিশ্চিত হয় পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ৭ আসামির মধ্যে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরমধ্যে দুইজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। আটক নিহতের ছেলের বন্ধু নীরব ও কসাই নুর ইসলামের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত কসাইর ধারালো চাপাতি, বালিশ, কোদাল, ভিকটিমের ব্যবহৃত কাপড় উদ্ধার করা হয়।

বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর বেলা ১১টায় নোয়াখালী পুলিশ সুপার অফিসে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্চের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

জানা যায়, নিহত নারীর ছেলে তার সহযোগীদের নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা করে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। নিহত নারীর দুই সংসারের দুই ছেলে ছিল। আগের সংসারের ছেলে বেলাল তার মা নূরজাহানকে জিম্মায় রেখে এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা সুদের ওপর ঋণ নেয়। ঋণ রেখে দেড় বছর আগে বেলাল মীরসরাই ব্রিকফিল্ডে মারা যায়। এরপর বেলালের ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তার পরের সংসারের ভাই হুমায়ুনকে পাওনাদাররা চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। হুমায়ুন তার মাকে এ বিষয়ে অবহিত করে। তার মা ভিকটিম হুমায়ুনকে তার ১৩ শতক জমি বিক্রি করে এ ঋণ পরিশোধ করার জন্য বলে। হুমায়ুন প্রতি উত্তরে তার মাকে জানান, মায়ের মালিকানাধীন ১৪ শতক ও বেলালের স্ত্রীর মালিকানাধীন ১০ শতক জমি বিক্রি করে বেলালের ঋণ পরিশোধ করা হোক। এতে তার মায়ের জোর অসম্মতি ছিল। অপরদিকে মা নূরজাহান তার ভাই দুলালের কাছে ৬২ হাজার ৫০০ টাকা পাওনা ছিল। পাওনা টাকা পরিশোধ করার জন্য সে ভাইকে প্রায় চাপ প্রয়োগ করতো। এ কারণে হুমায়ুনের মামাতো ভাই কালাম ও মামাতো বোনের জামাই সুমন ভিকটিম নূরজাহানের ওপর বেজায় রুষ্ট ছিল। এছাড়াও ভিকটিমের বাড়ির পাশের প্রতিবেশী ইসমাইল ও হামিদেরও নূরজাহানের জমির প্রতি লোভ ছিল। তাই তারাও হুমায়ুনকে প্রত্যক্ষ হত্যাকান্ডে সহযোগিতা করে।

হুমায়ুন জবানবন্দিতে পুলিশকে জানায়, বেলালের স্ত্রীর জমি থেকে ২ শতাংশ হামিদকে বাকি ৮ শতাংশ ইসমাইলকে দেয়া হবে বলে মৌখিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারপর মায়ের জমি সমান ৫ ভাগে ভাগ করে হুমায়ুন, নোমান, সুমন, কালাম ও কসাই নুরইসলামকে দেয়া হবে। এ প্রতিশ্রুতিতে সব ব্যক্তিরা গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে একটি ব্রিজের ওপর বসে হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করে। পরে হুমায়ুন, কালাম, সুমন ও অন্যান্য আসামিদের সহযোগিতায় ওই রাতের কোন এক সময়ে ঘরের মধ্যে বালিশ চাপা দিয়ে নূরজাহানকে হত্যা করে। বঁটি, চাপাতি, কোদাল দিয়ে ঘরের ভিতর ২ টুকরা করে এবং ঘটনাস্থলে ধান খেতের আইলে নিয়ে আরও তিন খন্ড করে মোট ৫ খন্ড পাওনাদারদের ধান খেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে তারা।

প্রেস ব্রিফিংকালে নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। নিহত নূরজাহান বেগম উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মৃত আবদুল বারেকের স্ত্রী। তিনি আট ছেলে ও এক মেয়েসহ ৯ সন্তানের জননী।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে চরজব্বার থানা পুলিশের পরিদর্শক ইব্রাহিম খলিল উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের উত্তর জাহাজমারা গ্রামের প্রভিডা ফিডের পিছনের একটি ধান খেত থেকে ওই গৃহবধূর টুকরা টুকরা মরদেহ উদ্ধার করে। তখন

ছেলে হুমায়ুন কবির পুলিশকে জানিয়েছিল, গত বুধবার ভোর থেকে তার মা নিখোঁজ ছিল। পরে স্থানীয় এক নারী বিকেলে ধান খেতের আইলে শামুক খুঁজতে এসে টুকরা টুকরা মরদেহ দেখতে পায়। পরে সে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার মায়ের মরদেহ শনাক্ত করে। গ্রেফতারকৃত আসামি নীরব কসাই নুর ইসলাম পূর্বেই সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর নিহত নূরজাহানের ছেলে ঘটনার মূল হোতা হুমায়ুন কবির হুমা ও আসামি সুমন আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ অন্য আসামি কালামের ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছেন। পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, যেহেতু নিহতের ছেলে হুমায়ুন কবিরের দায়ের করা মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে তাই তার দায়ের করা চরজব্বার থানায় তার দায়ের করা ৩নং মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। এই ঘটনায় চরজব্বার থানার ওসি (তদন্ত) বাদী হয়ে ৭ জনকে আসামি করে যে মামলা দায়ের করেছেন সে মামলা ডিবিকে তদন্ত ভার দেয়া হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জাকির হোসেন জানায়, এ মামলায় ৭ আসামির মধ্যে নিহত নূরজাহানের ছেলেসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলোন্ড হুমায়ুন কবির হুমা, নীরব, নুরুল ইসলাম কসাই, আবুল কালাম ও সুমন। আর পলাতক রয়েছে ইসমাইল ও হামিদ।