রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে বেপরোয়া থানা সন্ত্রাসী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রজ্জব গ্রেফতার

image

দিনাজপুরের ত্রাস রজ্জব বাহিনীর প্রধান রজ্জব সহযোগীসহ গ্রেফতার। তার বিরুদ্ধে ডাবল মার্ডার, পুলিশের ওপর হামলাসহ ৬টি মামলা রয়েছে। ১১ জুন বৃহস্পতিবার জেলা পুলিশের একাধিক টিম অনুসন্ধান তদন্ত চালিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিত করে তাকে গ্রেফতার করেছে। ১৪ জুন রোববার পর্যন্ত বর্তমান জেলা পুলিশ কর্মকর্তারা রজ্জবসহ তার বাহিনীর ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। এখনও তার বাহিনীর অর্ধশত ক্যাডার পলাতক রয়েছে। তার রয়েছে প্রায় ১৫টি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায়ী গ্রুপ। পুলিশ ও স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে রজ্জব বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দিনাজপুর শহর থেকে শুরু করে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও প্রকাশ্যে হুমকি দিত। দুটি হত্যা মামলার আসামি রজ্জব হুমকি দিয়ে বলে, যদি ২শ’ মামলার আসামি হই তার পরও পিছু হটবো না। শুধু তাই নয়, ২০১৫ সাল থেকে থানায় আড্ডা থেকে মানুষকে নানা হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজি করত। কোটি কোটি টাকার তার সম্পদ রয়েছে বলে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে জানা গেছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যখন সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখন তার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্রুপের সৃষ্টি হয়। অবশেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ইঙ্গিতে বৃহস্পতিবার রজ্জব বাহিনীর প্রধান রজ্জব সহযোগীসহ গ্রেফতার হয়েছে। তার সহযোগীদেরকেও ধরতে চলছে অভিযান। রজ্জবকে জেলা পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাত করা হবে। জিরো থেকে কিভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে তা উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। তার সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, গত ১১ জুন দিনাজপুর শহরসহ একাধিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার অভিযুক্ত দিনাজপুর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি ইমাম আবু জাফর রজ্জব ওরফে আবু ইনবে রজ্জব (৩৮) এছাড়া দিনাজপুর সরকারি কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাব্বির আহমেদ সুজনকেও গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম-১ এ ভেটেনারি ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক আয়োজিত বর্ষবরণ ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে ইমাম আবু জাফর রজ্জবের নেতৃত্বে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা মারাত্মক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা করলে তখন ছাত্রলীগের দুইজন কর্মী নিহতসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়। উক্ত ঘটনায় দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার মামলা (নং ৪৮) তারিখ ১৫ এপ্রিল ২০১৫। মামলা সুষ্ঠ তদন্ত ও ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ২০১৫ সালের ২৩ মে দিনাজপুর শহরস্থ নিমতলা প্রেসক্লাবে নিহতদের অভিভাবকসহ সচেতন দিনাজপুরবাসীর ব্যানারে মানবন্ধন কর্মসূচি চলাকালে রজ্জব বাহিনীর রজ্জব ৩০টি মোটরসাইকেলযোগে সহযোগীদের নিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে হত্যা মামলার বাদীর মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আঘাত করে। সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নেয় এবং প্রেসক্লাবের দরজা জানালা ভাঙচুর করে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি দেয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় আরও একটি মামলা দায়ের হয় (নং ৪৮) তারিখ ২৮ মে ২০১৫। ওই সময় সে গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে ছিল। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় আরও একাধিক মামলা রয়েছে। এওছাড়াও তার সহযোগী সাবেক ছাত্রলীগের নেতা সুজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলাও রয়েছে।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের গোপন প্রতিবেদনে জানা গেছে, রজ্জব ও সুজন গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের আদালতে নেয়ার সময় তাদের মুক্তির দাবিতে রজ্জব বাহিনীর সমর্থকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাথর নিক্ষেপ করে। এতে ৮ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় গত ১১ জুন একটি মামলা (নং ২১) দায়ের করা হয়। রজ্জব ও সুজন দিনাজপুর জেলা কারাগারে আটক আছে।

দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার এসআই আবদুল মালেক গত ১১ জুন আদালতে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলেন, রজ্জব বাহিনীর সহযোগী আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে সুজন সম্পর্কে আদালতকে জানিয়েছেন, আসামি সুজন এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে থানায় জিডি করায় বাদির বাড়িতে হামলা ও তা-ব চালিয়েছে। তারা সাক্ষীদের কাছ থেকে ১ লাখ চাকা চাঁদা দাবি করে। আর সাক্ষীদের লিচু গাছের ৮ বস্তা লিচু লুট করে নিয়ে গেছে। তারা সাক্ষীদের খুন করার হুমকি দিয়েছে। আসামি সুজন রিভলবার বের করে ঘটনার পর পালিয়ে যায়। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও রহস্য উদ্ঘাটনে আসামিদের জেলহাজতে রাখার জন্য আদালতে আবেদন করেছেন।

গত ১১ জুন ২০২০ আদালতে পাঠানো আসামি রজ্জব সম্পর্কে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামি রজ্জব করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে কেডিএস মাইক্রোবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাজে নিয়োজিত লেখা ও জরুরি খাদ্য সরবরাহ লেখাযুক্ত স্টিকার ব্যবহার করে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতির সময় রজ্জব বাহিনীর ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলো আবু মুসা, মাহবুব আলি শেখ, রাশেদ শেখ ও রাবিক হোসেন। জ্ঞিাসাবাদে জানা গেছে, তারা রজ্জবের নির্দেশে দিনাজপুরে ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ করত। পুলিশ বা অন্য কোন সংস্থার লোকজন যাতে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস না পায় তার জন্য সেনাবাহিনীর নামের স্টিকার ব্যবহার করত। তাদের হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধানী টিম তার সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে। রজ্জব যাতে দেশত্যাগ না করতে পারে তার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।