শুল্ক কর্মকর্তা আল আমিনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে দুদক

image

চাকরিতে যোগ দিয়ে ভুল করেননি তিনি। একাধিক জায়গায় কাজ করার সুবাদে ঘুষ ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অল্প দিনেই ৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ এফডিআরসহ বিভিন্নভাবে ব্যাংকের একাউন্টে গচ্ছিত রাখেন। আর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা এসব অর্থ রাখতে স্ত্রী, বোন, বন্ধুসহ আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবও ব্যবহার করেছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহকারী কর্মকর্তা (কাস্টমস) শরীফ মো. আল আমিন। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যম অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দুদক এসব তথ্য পায়। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আল আমিনের বিরুদ্ধে এবং তা ব্যাংক হিসেবে রেখে সহযোগিতা করায় আরও ১১ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার চার্জশিট দিচ্ছে দুদক।

দুদক সূত্র জানায়, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহকারী কমিশনার (কাস্টমস) শরীফ মো. আল আমিন তার পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ওই ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিলের জন্য সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন। এর আগে মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমতি চেয়ে কমিশনে আবেদন করেন। দুদক সূত্র জানায়, যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হচ্ছে তারা হলেন-সুনামগঞ্জের সহকারী কমিশনার (কাস্টমস) শরীফ মো. আল-আমীন, তার বন্ধু ও সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রেজওয়ানুল হক, শরীফ হাসিনা আজিম, বোন শরীফা খানম, আল আমীনের স্ত্রী ফেরদৌসী সুলতানা, আত্মীয় খায়রুল আলম, ছালেহা বেগম, রাবেয়া আক্তার, ফাতেমা বাচ্চু, এমএম হুমায়ুন কবির এবং কাজী নাদিমুজ্জামান।

দুদক সূত্র জানায়, শরীফ মো. আল-আমীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহকারী কমিশনার (কাস্টমস) পদে যোগ দিয়ে খুলনা বিভাগ ও সুনামগঞ্জের কাস্টমসের বিভিন্ন দফতরে কাজ করেছেন। অল্প দিনে কাজ করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। ব্যাংক হিসাবে তিনি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে বিশুদ্ধ করতে ব্যবহার করেছেন পরিবারের তিন সদস্য ও বন্ধুসহ ১০ আত্মীয়ের ব্যাংক হিসাব। ব্যাংক হিসাবে আল আমিন শরীফের ৬ কোটি টাকা গচ্ছিত পাওয়া গেছে। যেসব অর্থের বৈধ আয়ের কোন উৎস পাওয়া যায়নি। যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হচ্ছে ব্যাংক হিসাবগুলো তাদের। পুরো অর্থের মালিক আল আমিন নিজে হলেও অন্য আসামিরা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ তাদের ব্যাংক হিসাবে রেখে আল আমিনকে দুর্নীতিতে সহযোগিতা করেছেন। তাই মামলায় তাদের বিরুদ্ধেও চার্জশিট দেয়া হচ্ছে।

দুদক তদন্ত করে জানতে পারে শরীফ আল আমিন দুর্নীতি ও ঘুষসহ অবৈধ উৎসের টাকায় নিজ নামে বাগেরহাটের ব্র্যাক ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকার এফডিআর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংকের ক্যাম্পাস করপোরেট শাখায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ৬৫২ টাকা এফডিআর করেছেন। এছাড়া আল আমিনের মা শরীফ হাসিনার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংকের ক্যাম্পাস করপোরেট শাখায় ৪৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র, গোপালগঞ্জের ইসলামী ব্যাংকে ৩০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, তার বড় বোন শরীফা খানমের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংক শাখায় ৬১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার সঞ্চযপত্র, আল আমিনের স্ত্রী ফেরদৌসী সুলতানার গোপালগঞ্জ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৫৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকার এফডিআর, গোপালগঞ্জের এক্সিম ব্যাংকে ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংকে জমাকৃত ২৯ লাখ ৫ হাজার টাকা, আল আমিনের বন্ধু মো. রেজওয়ানুল হকের ব্র্যাক ব্যাংকের একাউন্টে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ও ব্যাংক এশিয়ার করপোরেট শাখায় ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। যার কোন বৈধ উৎস দেখাতে পারিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবধারীরা। তার অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে নিকট আত্মীয়দের কাউকে মৎস্য ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসার অংশীদার দেখিয়েছেন নথিপত্রে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে মিথ্যা কাগজে আর্থিক তহবিল সৃষ্টির মাধ্যমে শরীফ মো. আমীন দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে ৬ কোটি ২৬ লাখ এগার হাজার ২২২ টাকা অর্জন করেছেন। যা বৈধ করতে তিনি উৎস গোপন করার চেষ্টা করেছেন ও গোপনে সরাসরি সহায়তা করেছেন আসামিরা। তাই তাদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে চার্জশিট দাখিল করবে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা।