সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ যুবলীগ নেতাদের হাতে

image

চার গানম্যানের সঙ্গে যুবলীগ নেতা জিকে শামীম পিডব্লিউডি কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করেন

সরকারি বিভিন্ন অধিদফতর ও সংস্থার কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগের শীর্ষ নেতারা। তারা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন সংস্থার যাবতীয় সরকারি কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রায় সব সরকারি সংস্থা প্রভাবশালী যুবলীগ নেতাদের দখলে থাকায় সরকার সমর্থক সাধারণ ঠিকাদাররা ওইসব প্রতিষ্ঠানের ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে সাহস পান না। প্রভাবশালীরাই সব কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু আন্তজার্তিক দরপত্রে তাদের প্রতিষ্ঠানের মালপত্র সরবরাহের সক্ষমতা না থাকলে ওইসব কাজ যেসব প্রতিষ্ঠান পায়, তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন আদায় করছেন। যুবলীগ নেতাদের বিতর্কিত টেন্ডারবাজিতে অতিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আতঙ্কে রয়েছেন যুবলীগের চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ নেতারা। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদফতর (পিডব্লিউডি), আবদুল গণি রোডের খাদ্য ভবন, বিদ্যুৎ ভবন, শিক্ষা ভবন রেল ভবন, মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিসি ভবন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশনের নগর ভবনসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগের প্রভাবশালী নেতারা। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নিচের স্তরের নেতাকর্মীরা কোন দরপত্রে অংশগ্রহণের সাহসই পান না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিডব্লিউডির সব কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জিকে শামীম। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ‘ফেসবুক’কে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা গেছে, ছয়জন অস্ত্রধারী ব্যক্তির প্রটেকশন নিয়ে চলাফেরা করছেন তিনি। গত চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর যুবদলের সহ-সম্পাদক ও বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার।

গণপূর্ত ভবনে ঠিকাদারি পেশায় সম্পৃক্ত ছাত্রলীগের এক নেতা সংবাদকে বলেন, জিকে শামীম যেখানেই যান, অস্ত্রধারী ৫-৬ ব্যক্তিসহ ৫০ থেকে ৬০ জনের বহর নিয়ে চলাচল করেন। গণপূর্ত ভবনের পুরো ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবৈধভাবে ঠিকাদারি ব্যবসা করে তিনি এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাকে পেছন থেকে সহায়তা করছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক প্রভাবশালী নেতা।

রেলভবন ও কমলাপুর রেলওয়ের যাবতীয় ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। কমলাপুর ও ফকিরাপুলের বিভিন্ন বাস কাউন্টার থেকেও চাঁদাবাজি করছেন তার কর্মীরা। আশপাশের বিভিন্ন সরকারি দফতের চাঁদাবাজিও খালেদের লোকজন নিয়ন্ত্রণ করছে।

গোয়েন্দা সংস্থার অন্য একটি সূত্র জানায়, শিক্ষা ভবনে অবস্থিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শফিকুল ইসলাম। বর্তমানে শুধু রাজধানীতেই তার প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ চলমান। প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদারি করে তিনি এখন প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক। ঢাকায় রয়েছে ৫-৭টি বাড়ি ও নিজস্ব ফ্ল্যাট। কাজ বাগিয়ে নিতে গিয়ে ২০০৫-০৬ সালের দিকে শিক্ষা ভবনে গণপিটুনি খেয়েছিলেন শফিকুল ইসলাম। তার ভয়ে ইইডির ইঞ্জিনিয়াররা সব সময় আতঙ্কে থাকেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, শিক্ষা ভবনে কোন টেন্ডার হয় না। জেলা পর্যায়ে সব টেন্ডার হয়। সব টেন্ডার এখন ই-জিপিতে হয়। এতে প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। বর্তমানে যেসব কাজ করছি, সেগুলো দরপত্রের শর্ত মেনেই পেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর যে অভিযোগ, সেটি অপপ্রচার। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপ ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-ইঞ্জিনিয়ার এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তারা চাচ্ছেন না, আমি সৎভাবে ব্যবসা করি। ১৫ বছর ধরে শিক্ষা ভবনে যাইনি। আমাকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

শফিকুলের পাশাপাশি সম্প্রতি শিক্ষা ভবনে শক্তভাবে ঠিকাদারি কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন এক সময়ের আলোচিত ও ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা লিয়াকত সিকদার। তাদের প্রভাবের কারণে সরকার সমর্থক সাধারণ ঠিকাদাররা কোন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে সাহস পাচ্ছেন না। তিসিন সম্প্রতি শিক্ষা ভবনের একটি প্রকল্পের প্রায় ৬ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি ইইডির একটি ভবন নির্মাণের প্রায় ১৬ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নিয়েছেন।

জানা গেছে, খাদ্য ভবনে অবস্থিত খাদ্য অধিদফতর ও খাদ্য ভবন সংলগ্ন বিদ্যুৎ ভবনের যাবতীয় কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট, একই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও যুবলীগের আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম। এ ব্যাপারে মন্তব্য জানার জন্য ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাটের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে নগর ভবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাবতীয় কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন বিতর্কিত এক সংসদ সদস্য। তার সঙ্গে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাদের গভীর সখ্য রয়েছে। এছাড়া মতিঝিলের বিআইডব্লিউটিসি, রাজউক ভবন এবংও মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন সরকারি ভবনের টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন স¤্রাট ও খালেদ।