সুরক্ষাসামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়ম অনুসন্ধান করবে দুদক

image

করোনা সংক্রমণের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সরবরাহ করা মাস্ক, পিপিইসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ১০ জুন বুধবার দুদক কমিশনে এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করার প্রক্রিয়া চলেছে। এর আগে দুদক চেয়ারম্যান করোনা পরিস্থিতিতে মাস্ক, পিপিইসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

দুদকের পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার জানান, করোনাকালে এন-৯৫ মাস্ক, পিপিইসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রতারণা বা জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বুধবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গত ৫ জুন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, করোনা মহামারী শুরুর সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়-প্রক্রিয়া শুরু হয়, টেন্ডার হয়। এগুলো খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এসব ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে দুদক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এন-৯৫ মাস্ক এবং পিপিই ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি বা প্রতারণার কিছু খবর এসেছে। কমিশন এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন সংরক্ষণ করছে। ইকবাল মাহমুদ বলেন, কমিশন সার্বিকভাবে এসব কেনাকাটার বিষয়গুলো অনুসরণ করছিল। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তদন্ত সম্পন্ন করেছে বলে আমরা জেনেছি। এখন বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এরপরই পূর্ণাঙ্গ কমিশন বসবে এবং এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মাস্ক বা পিপিইর মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী যা চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ, এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারী নিয়ে প্রথমে স্বাস্থ্যখাতের কেনাকাটার দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এন-৯৫ এর মোড়কে করে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ। সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তারা এন-৯৫ মাস্কের কোন কার্যাদেশ জেএমআইকে দেয়নি। পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিষয়টি তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।

চিকিৎসকদের একটি সূত্র জানায়, এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অন্তরালে বিভিন্ন হাসপাতালে নিম্নমানের নকল এন-৯৫ মাস্কসহ চিকিৎসা সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে প্রশ্ন তোলায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে অন্যত্র বদলি করা হয়। পুরো পক্রিয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন। চিকিৎসকরা শুরু থেকে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের জন্য নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিইসহ চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রতিবাদকারী চিকিৎসকদের বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য সেক্টরে অনীয়ম-দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে। গত বছর বেশকিছু মামলাও হয় বেশকিছু চিকিৎসক, ঠিকাদারসহ স্বাস্থ্য অধিদতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য সেক্টরে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না করেও বিল ভাউচার দিয়ে টাকা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অনেক সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী, আসবাবপত্র সরবরাহের দরপত্র তৈরি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে। অনেক হাসপাতালে নিম্নমানের চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

দুদকের একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য সেক্টরে কেনাকাটায় দুর্নীতি অনীয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় দুদক এ পর্যন্ত ১৫টির বেশি মামলা করেছে। এসব মামলায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ অনেকেই আসামি। এসব মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।