ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন সুবিবেচক

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী: মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

image

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন সুবিবেচক। সমাজ সংস্কারক। বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণপুরুষ। তিনি সর্বদা মানব কল্যাণের চিন্তায় ব্যস্ত থাকতেন।

‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান’ ছিল তার পিএইচডির বিষয়। এখানে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ থেকে শুরু করে নানা প্রসঙ্গ এনেছেন।

তার কাজকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। এক. তার মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টি, দুই. তার সম্পাদিত শিল্প-সাহিত্য, তিন. প্রশাসনিক নেতৃত্বদান, চার. রাষ্ট্রীয় কল্যাণে অবদান। এর সব কটিতেই তিনি সফলতা দেখিয়েছেন।

ড. আনিসুজ্জামান মানুষ হিসেবে উদার, মানবিক, সমাজতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক। তার উদারতা, মহানুভবতা ও মানবিকতার কাছাকাছি মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়।

জাতীয় কল্যাণে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজের ভেতর থেকে আশা কাজের মাধ্যমে। কোন ক্ষেত্রেই তিনি নিজের মতামতকেই প্রাধান্য না দিয়ে সকলের কথা শুনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিতেন। নানা বিষয়ে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করতেন। কিন্তু তার মতকেই প্রাধান্য দিতে হবে এমনটি কখনো তিনি করেননি। ১৯৯০ এর দশক থেকে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আমৃত্যু এখানে কাজ করেছেন। সাধারণত এই বৃদ্ধ বয়সে মানুষের বিবেকে কিছুটা ঘাটতি দেখা যায় কিন্তু ড. আনিসুজ্জামান স্যারের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। তিনি নিজের বিবেককে শাণিত রেখেছিলেন।

বাংলা একাডেমি ছাড়াও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। কারো দ্বারা তিনি প্ররোচিত হয়ে ও আবেগে কোন সিদ্ধান্ত নিতেন না। একজন সুবিবেচক ছিলেন। জাতীয় বিবেক ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা একাডেমি অবকাঠামোগত দিক দিয়ে পরিবর্তন আসে। আমরা এখানে ৮টি বিভাগে কাজ করছি। মৌলিক গবেষণা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতিভিত্তিক দলিল তৈরিসহ নানা বিষয়ে কাজ হচ্ছে। সম্প্রতি বঙ্গভবনের একশ বছরের ইতিহাস নামক একটি বই সম্পাদনার কাজ চলছিল ড. আনিসুজ্জামান স্যারের সভাপতিত্বে। সেখানে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রপতির দ্বিমত ছিল। আমরা সেটি স্যারের নেতৃত্বে সুন্দরভাবে সম্পাদন করছি। এভাবে নানা মত তিনি গ্রহণ করেছেন।

তা ছাড়া চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দুইশততম জন্মবার্ষিকী আসছে। সেটি নিয়েও স্যার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যুর পর তার মূল্যায়ন শুরু হয়। যেমন তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, লেখালেখি ইত্যাদি। এসব শুরু হয়েছে। তিনি যে স্থানে ছিলেন তার মতো মানুষ খুব কম তৈরি হয়। যারা সদা-সর্বদা মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ড. আনিস স্যার তারমধ্যে একজন। আমরা তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি তার রেখে যাওয়া কাজের মূল্যায়ন করে।