বাঁধন হারা মায়ার বাঁধন : মিলি রহমান

image

রুদ্রর সকালটা শুরুই হয় চরম হট্টগোলের মাঝে। তার বাসার পাশেই বস্তি। সকাল হতেনা হতেই বস্তির সব মহিলা একই সময় কলের পাড়ে এসে চিৎকার করতে থাকে। সবাই একসঙ্গে তাদের অভিযোগ জানাতে থাকে। কে যে শ্রোতা বোঝা যায়না। রুদ্র অবশ্য অনেকবার চেষ্টা করেছে আলোচনার ভাববস্তু বুঝতে, তবে ব্যর্থ হয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

আজ সকালে মরার উপর খাড়ার ঘা এর মত তার স্ত্রী প্রিয়াও চিৎকার শুরু করেছে। শুনছো, এই! শুনছো, এই এখনও উঠলেনা। দেখে যাও একবার।

রুদ্রর মনে হচ্ছে জাপানের হিরোশিমায় বোমা ফেলার পরে সেখানকার মহিলারা যে চিৎকার দিয়েছিল তার তীব্রতা প্রিয়ার চেয়ে কম ছিল। চিৎকার চেচামেচির উপর অস্কারের ব্যবস্থা থাকলে নির্ঘাত প্রিয়া তা পেয়ে যেত।

রুদ্র পাশবালিশটা মাথার উপর চেপে ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলো। একেবারে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রিয়া ঘরের ভেতরে এসে পৌঁছালো। এবার কানের উপর অত্যাচার থেকে বাঁচতে রুদ্র উঠেই পড়ল। হাসিহাসি মুখে সন্ধির চেষ্টা করে সাদা পতাকার পরিবর্তে সাদা দাঁত বের করে মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। খুব একটা কাজ হলনা।

কতক্ষণ ধরে ডাকছি। আমার কত কাজ। ঘরে চাপাতা নাই। যাও বেড-টি খেতে চাইলে এক্ষণ চাপাতা নিয়ে আসো। সকালেই বিনা মেঘে বজ্রপাত। রুদ্র বোঝানোর চেষ্টা করল। দেখো বেড-টি হচ্ছে বিছানার চা। তা সকালে বিছানা থেকে উঠে চারতলা থেকে নেমে গিয়ে চাপাতা এনে আবার বিছানায় বসে সেই বেড-টি খাওয়া কি ঠিক হবে?

নিজের যুক্তিতে সে নিজেই মুগ্ধ। কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। এখনই যাও। কোন কথা না। তোমার বেডটি না হয় আজ টেবিলটি হোক। আমার অনেক কাজ আছে। পড়েছি মোঘলের হাতে বলতে বলতে রুদ্র টি-শার্টটি গায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

রুদ্র প্রিয়ার প্রায় দশ বছর বিয়ে হয়েছে। রুদ্র একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। তাদের ছেলে মেয়ে নেই। বিয়ের পর প্রিয়া খুব নরম সরম মেয়েছিল। খুব মনদিয়ে ঘর সংসার করত। এখন যত দিন যাচ্ছে প্রিয়া তত রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। কেন যে, রুদ্র তা বুঝতে পারেনা। মাঝে মাঝে প্রিয়াকে রুদ্রর প্রাইমারী স্কুলের হেড মিস্ট্রেজ মনে হয়, না না পিটি টিচার মনে হয়। সারাক্ষণ লেফট রাইট।

চাপাতা আনতে দরজা দিয়ে বের হতেই পাশের ফ্ল্যাটের রুপার সাথে দেখা। কোন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।

এই সাত সকাল বেলা একেবারে বিয়ের কনের সাজ দিয়ে বের হচ্ছে। ও কি সারারাত জেগে সেজেছে নাকি?

আর নেলপলিশ থেকে শুরু করে ব্যাগ, মেকাপ, ড্রেস সব নীল। শুধু চুলটা যদি নীল হত। রুদ্রকে দেখেই গলে গিয়ে ডাক দিল ভাইয়া। একেবারে চার আলিফ টান। মনে হয় এখনই গলেপড়বে। এত সকালে কোথায় যাচ্ছেন ভাইয়া?

কাগজ কুড়াতে সকাল নাকি রাস্তায় অনেক কাগজ পড়ে থাকে। এক বস্তা যদি আনতে পারি। আমার অফিসে যাবার পথে একটা ভাঙ্গরীর দোকান আছে ওখানে বিক্রি করে দেবো। কেজি প্রতি আট টাকা। দশ কেজি কুড়াতে পাড়লে আশি টাকা।

ওহ! ভাইয়া you are really funny! কি যে মজার কথা বলেন না। হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে যায়।

রুদ্র মনে মনে বলতে থাকে হাসতে হাসতে না। আমার তো ইচ্ছে করছে গলায় চিপ দিয়ে তোর দম পুরোপুরি বের করে দেই। যা ভাগ এখান থেকে। কিন্তু তা আর বলা হল না। রুপাকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে গেল। তখনো হাসছে ! আজকাল মেয়েগুলো এত গাধা হয় কেন।

রুদ্রর ইদানিং যেন কি হয়েছে। সারাক্ষণ শাসনে মনে হয় মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায়ই মানুষের সঙ্গে আবোল তাবোল বলে।

চাপাতা নিয়ে এসে সোফায় পা তুলে বসতেই প্রিয়ার চিৎকার কতবার বলেছি সোফায় পা তুলে বসবেনা। তুমি করে একটু শোধরাবে পা নামাও। নামাও বলছি।

জীবনটা অসহ্য হয়ে গেল। ইদানিং প্রিয়া খুব বেশি শাসন শুরু করেছে। শব্দ করে চা খাবেনা এত জোড়ে দরজা লাগালে কেন? অফিস থেকে ৪০ মিনিট পরে আসলে কেন? এই শার্টের সাথে কি এই টাই নামায়? গোসল করে তোয়ালেটা বারান্দায় দিতে পারোনা? এ রকম হাজারটা অভিযোগ। আর ভাল লাগেনা। কোন রকমে বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে যেতে পারলেই শান্তি। কিন্তু অফিসেও সময়ের আগে যেতে পারবেনা। তাহলেও জবাবদিহি করতে হবে।

অফিসে প্রায়ই সে অন্যমনস্ক থাকে। হঠাৎ মনে হল অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছি বলে কয়েক দিন ঢাকার বাইরে গিয়ে একা একা বেরিয়ে আসলে কেমন হয়? ওহ মনে হয়েই নাচতে ইচ্ছে করছে। অফিস না হলে একটা লুঙ্গি ড্যান্স দিয়েই ফেলত। বসের কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে পাঁচ দিনের ছুটি নিল।

বাসায় যাবার পথেই কক্সবাজারের টিকেট কিনে ফেলল রুদ্র। সে তার খুশি আর চেপে রাখতে পারছেনা। তবুও খুব উদ্বিগ্ন মুখে বাসায় ঢুকে প্রিয়াকে বলল আর ভালো লাগেনা। পরের চাকরির এই এক বিড়ম্বনা। কথা নাই বার্তা নাই কাল কক্সবাজার যাও। আরে আমাদেরও তো ঘর সংসার আছে। কমলাপুর রেল ষ্টেশনে তো থাকিনা, যে রাতে যখন খুশি গিয়ে বস্তা পেতে কাত হয়ে শুলাম না হয় ফিরলামই না।

প্রিয়াকে অনেক ভূমিকার পর অফিসের ট্যুরের কথা বলতেই প্রিয়া ভাবলেশহীন মুখে টেবিলে রাতের খাবার দিয়ে রুদ্রের ব্যাগ গোছাতে লাগলো।

রুদ্র সকালেই রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছে গেল কক্সবাজার। সোজা চলে গেল হোটেলে। গিয়েই জুতা খুলে মোজা পরেই শুয়ে পড়ল খাটে। হঠাৎ খুব শূন্য শূন্য মনে হল পৃথিবী। কেউ তাকে বলছেনা মোজা পড়ে শুলে কেন? হাত মুখ না ধুয়ে বিছানায় যাবে না। কত অবাধ স্বাধীনতা। তাও কেন যেন ভালো লাগছে না। রাতে খেতেও ইচ্ছে হলনা। ও রকমই শুয়ে কত কিছু চিন্তা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে খুব অপেক্ষা করছিল প্রিয়ার ডাকের জন্য কিন্তু কে ডাকবে। রুদ্রর ঠিক বুঝতে পারছেনা তার কেন এমন লাগছে। কত চমৎকার জায়গা, নিরিবিলি, কি চমৎকার প্রকৃতি, প্রকৃতির এত কাছে থেকেও মনে কোনো প্রশান্তি পাচ্ছেনা কেন?

সারাদিন এখানে ওখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ালো। রাতে হোটেলের রুমে এসে সিদ্ধান্ত নিল কাল সকালেই ঢাকা ফিরবে। আসলে প্রিয়ার শাসন যে খুব মিস করছে।

মানুষের মন বড় বিচিত্র। ভালবাসার শাসন অত্যাচার মনে হলেও মানুষ ভালবাসা ছাড়া বাঁচতে পারেনা। প্রিয়ার আসলে শাসন ছিলনা। সব নিষেধাজ্ঞায় ছিল ভালবাসা। মানুষ জন্মগত ভাবে স্বাধীন কিন্তু প্রকৃতভাবে পরাধীন। সে কারো না কারো ভালবাসার পাখায় ভর করে স্বপ্নের আকাশে উড়তে চায়।

রুদ্রর তাই ভালোবাসা বিহীন দুটো রাতও অসহ্য মনে হল। ফিরে গেল প্রিয়ার কাছে। হোক না কড়া শাসন। তবুও তো তার এমন একজন আছে যে সারাক্ষণ শুধু তাকে নিয়েই ভাবে। তার খাওয়া, পড়া, ঘুম নিয়েই চিন্তা করে। এটাই তো ভালবাসা। প্রকাশভাঙ্গিটা হয়তো ভিন্ন। এ ভালোবাসা ছাড়া রুদ্র বাঁচতে পারবেনা। শাসনের পাথর দেয়ালের ভেতরের যে স্নিগ্ধ সুরভিত অনুভূতি তার সন্ধান যেন আজই রুদ্র পেল।

আসলেই এটাইতো বন্ধন। বাঁধন হারা মায়ার বাঁধন।

-মিলি রহমান

সহযোগী অধ্যাপক

ইংরেজি বিভাগ

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ইমেইল: anhara.chowdhury@gmail.com